প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
বিশেষ বার্তাবাহক ঃ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই সাজা দেওয়া হয়েছে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র (শীর্ষ নেতৃত্বের দায়) দায়ে।
আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দণ্ডিত পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিতরণ করা হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গত বছরের ১৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
১০ মাস পর আরেকটি মামলায় গতকাল দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খানকে এবং ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এই সাত আসামিই পলাতক। তাঁদের মধ্যে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। এসব অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো গতকাল।
দুটি ট্রাইব্যুনালের ৭টি রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।
রায়ের আগে যা বললেন ট্রাইব্যুনাল
তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে এজলাসে আসেন। পরে কয়েকটি মামলার শুনানি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়।
ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায় ঘোষণার শুরুতে বলেন, এই মামলার অনেক কাগজ। তাঁদের পড়তে কষ্ট হয়েছে। রায় দিতে কষ্ট হয়েছে। প্রসিকিউশনেরও কম কষ্ট হয়নি। সাক্ষীরাও কষ্ট করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তা অবর্ণনীয় পরিশ্রম করেছেন। সাংবাদিকেরাও সহযোগিতা করেছেন। সবাইকে ধন্যবাদ।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম বলেন, রায়ের কপি ৫৫০ পৃষ্ঠার বেশি। পৃষ্ঠা আরও বাড়বে। পুরো রায় ইংরেজিতে। তবে সহজে বোঝার জন্য এর কিছু অংশ বাংলা করে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁদের পুরো রায় পড়া উচিত ছিল। আসামিরা উপস্থিত থাকলে পড়ে শোনাতেন। এরপর আসামিদের কার কী সাজা, তা ঘোষণা করেন তিনি।
৪৫৪ দিনে তদন্ত থেকে রায়
প্রসিকিউশন জানিয়েছে, ওবায়দুল কাদেরসহ এই মামলার দণ্ডিত সাত আসামির বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৮ জুন। তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। পরে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।
এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সেদিন সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২৮ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ নেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৭ আগস্ট। গতকাল রায় ঘোষণা করা হলো।