১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার,বিকাল ৪:২৮

শিরোনাম
ক্ষমতাবলয়ের অনিয়ম ও ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অপূর্ণ আশা গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান-এর ইশারায় তিন টেক্কা’র রাজত্ব, কমিশন বাণিজ্য যেন সরকারি নীতিমালার মধ্যে পড়েছে মসজিদের অর্থ আত্মসাৎ ও মারামারির মামলায় নৈশপ্রহরী জামালকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছে বাঁধনের ওপর হামলা, সংসদে যা বললেন বিএনপির নারী এমপি খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আবুল কালাম এক্সপ্রেসওয়েতে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বাসচালক রিমান্ডে, দুজন কারাগারে কৃষি, ডেইরি ও পোল্ট্রি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে সরকার শাহজালালে আকস্মিক পরিদর্শনে বিমানমন্ত্রী, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে সময় কমানোর নির্দেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়া কোনো স্লোগান নয়, পরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী

গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান-এর ইশারায় তিন টেক্কা’র রাজত্ব, কমিশন বাণিজ্য যেন সরকারি নীতিমালার মধ্যে পড়েছে

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ইশারায় তার ঘনিষ্ঠ তিন কর্মকর্তা সংস্থাপন, বদলি, টেন্ডার এবং পদোন্নতিসহ অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অধিদপ্তরের সাধারণ প্রকৌশলীদের একাংশ এই তিন কর্মকর্তার প্রভাব ও অনিয়মকে কেন্দ্র করে তাদের নাম দিয়েছেন তিন টেক্কা’

এই তিন কর্মকর্তা হলেন:

মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন শাখা)।

মোহাম্মদ বদরুল আলম খান: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা সার্কেল-১)।

ড. আবু নাসের চৌধুরী: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা সার্কেল-২)।

মূল অভিযোগসমূহ:

বদলি নিয়োগ বাণিজ্য: ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মিত বদলি ও পদোন্নতিতে অসাধু লেনদেনের অভিযোগ।

টেন্ডার কমিশন নিয়ন্ত্রণ: পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রতিটি প্রকল্প থেকে নির্ধারিত কমিশন আদায়ের সিন্ডিকেট পরিচালনা।

তহবিল সংগ্রহ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে উন্নয়ন প্রকল্প গণপূর্তে বাস্তবায়নের অজুহাতে অন্য প্রকৌশলীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা তোলার গুঞ্জন।

বিভাগীয় ব্যবস্থা এড়ানো পক্ষপাতিত্ব: গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের বলয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বহাল রাখা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো দ্রুত মেরামতের অজুহাতে টেন্ডার ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত, পছন্দের ঠিকাদারকে বড় প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অবৈধ প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে তিনি জড়িত। এছাড়া প্রকল্পের অর্থছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কাজে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে বদলি করে রিজার্ভে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিকানা নিয়েও তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজধানীর উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় জমি-ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরে জমি ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তার বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব সম্পদের কিছু অংশ ভাইবোনদের নামে কেনা হলেও নেপথ্যে মূল মালিক বদরুল আলম খানই।

গাজীপুরে দায়িত্ব পালনের সময় পরিচালিত একাধিক প্রকল্প নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

কৃষি বিপণন ভবন: প্রায় ৫ কোটি টাকা

বিএসটিআই সিভিল ভবন: ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা

মেট্রোপলিটন সদর থানা: ২০ কোটি ২৪ লাখ টাকা

সদর উপজেলা মডেল মসজিদ: ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা

কালিয়াকৈর থানা: প্রায় ১০ কোটি টাকা

পুবাইল থানা: ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা

কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ: প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা

অভিযোগ রয়েছে, এসব গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্রকল্পে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের আরও একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে

প্রকল্পে অনিয়ম অগ্রিম বিল: গাজীপুর তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম নির্মাণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্য খাতের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মিরপুরের পাইকপাড়া আবাসিক প্রকল্প ও পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ব্ল্যাকমেইলিং অর্থ দাবি: একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর অভিযোগ, বদরুল তার পরিচিত নারীদের দিয়ে প্রথমে প্রকৌশলীদের ফাঁদে ফেলতেন। পরবর্তীতে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হতো এবং বিষয়টি জটিল হলে নিজেই সমাধানকারী হিসেবে আবির্ভূত হতেন।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তার বক্তব্য: খুলনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম জানান, ঢাকায় থাকাকালে এক নারী তাকে ফোন করে ব্ল্যাকমেইল করেন, যার সঙ্গে বদরুলের পরিচয় ছিল। পরে বদরুলই তা সমাধানের প্রস্তাব দেন। এ ঘটনার জেরে আতিকুলকে সাময়িক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে প্রায় ছয় মাস পর খুলনায় বদলি করা হয়।

বিভাগীয় শাস্তি: এর আগে ময়মনসিংহে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের কারণে তাকে ওএসডি (OSD) করা হয়েছিল। সম্প্রতি এসব অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে মন্ত্রণালয় তাকে পুনরায় ওএসডি করেছে।

উল্লেখ্য, এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বদরুল আলম খানের সঙ্গে একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপে “ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে তার কোনো উত্তর পাইনি ।

বদলি বাণিজ্যের নেপথ্যে সারোয়ার জাহান

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ আরেক ‘টেক্কা’ হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান। সম্প্রতি বদলি বাণিজ্য বন্ধে মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নিলেও, লটারির আগেই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) পদের জন্য ঢাকা জেলার বাক্সে ৪১ জনের নাম আগেভাগে যুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান অভিযোগসমূহ:

সিকিউরিটি মানি আত্মসাৎ বিভাগীয় মামলা: গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পেলে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তবে শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে উল্টো তিনি পদোন্নতি পেয়ে প্রভাবশালী সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব বাগিয়ে নেন।

গণবদলি আর্থিক লেনদেন: দায়িত্ব পাওয়ার পর গত বছর ৩ মার্চ একদিনেই নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ৫০ জনেরও বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করেন তিনি। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে পছন্দের জায়গায় পদায়নের অভিযোগ উঠলে পরবর্তীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এই গণবদলি স্থগিত করা হয়।

বদলি স্থগিত অপকর্ম: গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে অনিয়মের মাধ্যমে বদলি করা হয়। এ সংক্রান্ত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছালে মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম ও মো. এরশাদুল হকের বদলি আদেশ স্থগিত করে মন্ত্রণালয়।

এছাড়া সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে।

(এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান দাবি করেন, বদলি সংক্রান্ত সব বিষয় মন্ত্রণালয় জানে। লটারির বাক্সে আগে থেকে নাম যুক্ত করার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান।)

প্রধান প্রকৌশলীর পরামর্শক . আবু নাসের চৌধুরী

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলীর অন্যতম ‘টেক্কা’ হিসেবে পরিচিত। অন্য কর্মকর্তাদের দাবি, নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তিনি মূলত প্রধান প্রকৌশলীর ‘উপদেষ্টা’ বা ‘পরামর্শক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।

তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগসমূহ:

অনিয়ম জালিয়াতি: কাজের অগ্রগতির চেয়ে অতিরিক্ত বিল প্রদান, প্রকল্পের খরচ বাড়ানো এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে অধীনস্থ নির্বাহী প্রকৌশলীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সরকারি অর্থ অপচয়সহ তার অধীনস্থ বিভিন্ন প্রকল্পে শতাধিক অডিট আপত্তি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিন্ডিকেট পরিচালনা: সচিবালয়, হাইকোর্ট ও সংলগ্ন সরকারি হাসপাতালগুলোর সংস্কার ও নির্মাণকাজে প্রভাব বিস্তার করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের মেরামত কাজে প্রকৃত খরচের দ্বিগুণ বিল তৈরি করে উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানো হয়। নির্বাহী প্রকৌশলীরা এসব অনিয়ম করলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।

বগুড়ায় অনিয়মের ইতিহাস: বগুড়ায় দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতিসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল।

(এসব বিষয়ে আবু নাসের চৌধুরী বলেন, “প্রধান প্রকৌশলী স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন; তবে কোনো সিন্ডিকেট বা অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই।”)

গৃহায়ণ গণপূর্ত সচিবের বক্তব্য

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান জানান, প্রধান প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট ও তাদের অনিয়ম সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সচেতন রয়েছে এবং বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ে এক কর্মকর্তাকে ওএসডি (OSD) করা হয়েছে। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  ( চলবে )

 

  • শেয়ার করুন