প্রকাশিত: এপ্রিল ২০, ২০২৬
প্রকাশিত:
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ

বন বিভাগের ফরেস্ট গার্ডদের পদোন্নতি নিয়ে চলমান সংকটে এবার আইনি হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ চার দশকের বঞ্চনা, পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে ফরেস্ট গার্ডদের (বন প্রহরী) অধিকারের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-০১, ঢাকা-এর সাম্প্রতিক এক আদেশে বন বিভাগের বিতর্কিত গ্রেডেশন তালিকা এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আদালতের কঠোর অবস্থান ও কারণ দর্শানোর নোটিশ ঃ
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-০১ এর সদস্য (জেলা জজ) মো. আমিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বিবাদীদের (মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তর) প্রতি কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আদেশে কেন ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখের বিতর্কিত চূড়ান্ত গ্রেডেশন তালিকা (স্মারক নং- ১৮৫৩) এবং পদোন্নতি সংক্রান্ত অফিস আদেশ অবৈধ ও আইনগত ভিত্তিহীন ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এই নির্দেশনাটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট ৫ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সরাসরি প্রেরণ করা হয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষন ঃ
মো. ওমর ফারুক ও অন্যান্যদের দায়ের করা (এ.টি মামলা নং- ১১০/২০২৬) মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের। মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পিটিশনাররা বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়ে পরবর্তীতে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত ও নিয়মিত হয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রথম নিয়োগের তারিখের পরিবর্তে ‘নিয়মিতকরণের তারিখ’ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনা করেছে, যা তাদের অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।
দুর্নীতির অভিযোগ:
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রায় ৪৫০ জন ফরেস্ট গার্ডের পদোন্নতি নিশ্চিত করার নামে প্রধান বন সংরক্ষকের আত্মীয় পরিচয়দানকারী সাবেক অফিস সহকারী আশরাফুল আলম ( অবঃ) আসলাম হোসেন এবং মোজাম্মেল হোসেন ও আবুল হোসেন ফরেষ্ট গার্ড এদের সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে জুনিয়রদের সিনিয়র করে গ্রেডেশন তৈরী করে প্রকৃত সিনিয়রদের আত্মসম্মানে আঘাত করে এবং মানসিক আক্রন্ত করে দিয়েছে। তারা বিধিমালা লঙ্ঘন করে জুনিয়রদের সিনিয়রিটি তালিকায় আগে রাখার মাধ্যমে এই বিশাল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
আদালতের নজরে কর্তৃপক্ষের ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ ঃ
আদেশে আরও উল্লেখ করা হয় যে, পিটিশনাররা এর আগেও এই গ্রেডেশন তালিকা নিয়ে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে সমাধানের আশ্বাস (Assurance) দেওয়া হয়েছিল। সেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই ফরেস্ট গার্ডরা তাদের আগের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রশাসনিক সমাধান না করে উল্টো গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (স্মারক নং- ১৩৪) সেই বিতর্কিত তালিকার ভিত্তিতেই পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করার অফিস আদেশ জারি করা হয়। আদালতের ভাষায়—এটি পিটিশনারদের অধিকার ও জ্যেষ্ঠতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বিষয়গুলো আমলে নিয়ে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হয়েছে এবং বিবাদীদের ওপর নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আগামী ২৪ জুন ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালতের এই আদেশের ফলে বন বিভাগের বিতর্কিত পদোন্নতি প্রক্রিয়া এখন আইনি বাধার মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সাধারণ ফরেস্ট গার্ডদের দাবি—মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বন মন্ত্রীসহ প্রধান বন সংরক্ষক যদি সদিচ্ছা পোষণ করেন, তবে একটি ‘নির্বাহী আদেশের‘ মাধ্যমে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের তারিখ হতে জ্যেষ্ঠতা নিশ্চিত করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেন। আদালতের বর্তমান পদক্ষেপ সাধারণ কর্মীদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে যে, সত্য ও ন্যায়ের জয় হবেই।