প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
প্রকাশিত:
বিশেষ প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের নানুপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারী মাহফুজুর রহমান (যার ২০১৫ সালের স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ মূল বেতন ছিল ২২,৪৯০ টাকা)। কম বেতনের চাকরিজীবী হলেও ২০২১ সালের দিকে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামে বিপুল পরিমাণ আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জন, দপ্তরে ভুয়া দলিল সৃজন, দাগ পরিবর্তন এবং বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের বিপুল রাজস্ব আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নিবন্ধন অধিদপ্তর বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেয় চট্টগ্রাম পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রারকে। তৎকালীন সাব-রেজিস্ট্রার ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি তিন পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেন। তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে অভিযুক্ত মাহফুজুর রহমান কর্তৃক চট্টগ্রামের চান্দগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১২৪৬/১৬ ও ১৭৭৪/১৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে স্ত্রী দিলুয়ারা মাহফুজের নামে কোটি টাকারও বেশি অর্থের জমি ক্রয়ের সত্যতা পাওয়া যায়।
শাস্তির নামে প্রহসন ও সাময়িক বরখাস্ত: অভ্যন্তরীণ তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারের নিবন্ধন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিদর্শক শহীদুল আলম ঝিনুক অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১৬ মে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে মাহফুজুর রহমানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই আদেশে অভিযুক্ত মাহফুজকে জেলার সন্দ্বীপ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়! গুরুতর দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও কীভাবে একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী পদগুলোতে বহাল থাকেন, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
রাজনৈতিক খোলস বদল ও রেহাই: অনুসন্ধানে পাওয়া মাহফুজুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চিঠিতে এক রোমাঞ্চকর তথ্য মেলে। তদন্ত চলাকালে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া ওই চিঠিতে মাহফুজ নিজেকে “আওয়ামী পরিবারের সন্তান” এবং তাঁর বাবাকে “মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সৈনিক” দাবি করেন। ২০১৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের জেরে বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ প্রত্যাহার করে সাময়িক শাস্তি মওকুফ করা হয় এবং চূড়ান্তভাবে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পটপরিবর্তনের পর গত ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে মাহফুজ রূপ বদলে হয়ে যান ‘বড় বিএনপি নেতা’। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি দীর্ঘ চিঠি দেন তিনি। এবার তিনি নিজেকে “বিএনপি পরিবারের সন্তান” প্রমাণে প্রাণপণ চেষ্টা চালান। ওই চিঠিতে বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা সুপারিশও করেন, যার বিনিময়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তাঁর অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তাঁকে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা থেকে জ্যেষ্ঠতার অজুহাতে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে পদায়ন করা হয়।
চলমান দুদকের মামলা: এদিকে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর স্ত্রীর নামে কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাহফুজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-১। উপসহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরীর দায়ের করা ওই মামলায় মাহফুজুর রহমানের স্ত্রী দিলুয়ারা মাহফুজকে প্রধান আসামি করা হয় (তাাঁদের মূল বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায়)।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মাহফুজ দম্পতি ১ কোটি ৭ লাখ ২ হাজার ৭৪৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ২১ টাকার সম্পদ গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যার দরুন দুদক আইনের ২৬(২), ২৭(১) এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধ নথিভুক্ত হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অস্পষ্টতা: নবাগত চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য পেতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো ও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সাম্প্রতিক বদলি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা নম্বর রেজিস্ট্রারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম সদর সাব–রেজিস্ট্রি অফিস একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। এখানে একজন দক্ষ অফিস সহকারী দরকার, যার কারণে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে সদর অফিসে পদায়ন করা হয়েছে।“
অন্যদিকে, দুদকের মামলা সম্পর্কিত বিষয়ে জানতে জেলা রেজিস্ট্রার খন্দকার জামিলুর রহমানের মুঠোফোনে (০১৭১০০…২৩৪) একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
আইন কী বলে? সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হলে বা তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দুদকের মামলা চলমান থাকলে তাঁকে কোনো ধরনের পদোন্নতি, পদোন্নতিজনিত বদলি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়নের কোনো সুযোগ নেই। তবুও কীভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে মাহফুজুর রহমান একের পর এক সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অঙ্গনে তৈরি হয়েছে চরম ক্ষোভ ও বিস্ময়।