প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
বিশেষ প্রতিনিধি ঃ
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে ভিআইপি-সিআইপি যাত্রীদেরও নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বলতে গেলে বিমানবন্দরের ভেতরে বাইরে কোথাও স্বস্তি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। দেখা যায়, কনকোর্স হল, মূল ভবন, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্টসহ ঘাটে ঘাটে চলে হয়রানির মচ্ছব। তুই-তোকারি থেকে শুরু করে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণের পাশাপাশি হুমকি-ধমকিও পাচ্ছেন যাত্রীরা। এছাড়া ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিমানবন্দরে আসা-যাওয়া যাত্রীদের টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অহরহই।
জানা গেছে, নজিরবিহীন এমন কর্মকাণ্ড শুধু একদিনই নয়, ঘটছে প্রতিনিয়ত। ভুক্তভোগীরা বলছেন, হয়রানির হাজারো অভিযোগ নিয়ে একের পর এক বৈঠক, মন্ত্রীপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল অ্যাভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতায়ও হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। যারা যাত্রীদের হয়রানিমুক্ত করার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই উল্টো যাত্রী হয়রানির ঘটনা ঘটাচ্ছেন। কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেরিয়ে আসার মুহূর্তেও দেশে ফেরত বিজনেস ক্লাস যাত্রীদের আটকে দেওয়া হয় নানা অজুহাতে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত ও নাজেহালের শিকার হন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিরা। তারা দেশে ফেরা ও কর্মস্থলের উদ্দেশে দেশত্যাগ- উভয় ক্ষেত্রেই চরম হয়রানির শিকার হন। যাদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে, সেই প্রবাসী কর্মজীবীদের সঙ্গে কাস্টমস বিভাগের আচরণ আরো রুঢ়, আরো ন্যক্কারজনক। বিমানবন্দরে কাস্টমস চেকিং পয়েন্টে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাঙালিদের পাসপোর্ট হাতে নিয়েই লাগেজ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। ভুক্তভোগী যাত্রীরা মানসম্মানের দিকে তাকিয়ে বিদেশি মুদ্রা হাতে গুঁজে দিয়েই দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজেন।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরেছেন প্রবাসী আলগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের টার্মিনালের বাইরে আমার ছোট ভাই ও পরিবারের লোকজন আসছে আমাকে নিতে, এখানকার কয়েজন আনসার সদস্যের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তারা আমার ছোট ভাইয়ের গায়ে হাত তুলে।’
তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের ভেতরে যে কি পরিমাণ হয়রানি হতে হয় তা বাদ দিলাম। বের হয়ে যে একটা ট্যাক্সি নেব, তারও উপায় থাকে না। ২০০ টাকার ভাড়া হাজার টাকা চেয়ে বসে। লাগেজ নিয়ে করে টানাটানি। তারা মনে করে বিদেশ থেকে আমরা কোটিপতি হয়ে আসি। পদে পদে টাকা চায়।’
আলমগীরের মতো হাজারো প্রবাসী প্রতিদিন শিকার হন এমন হয়রানির। বিমানবন্দরটিতে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুট মিলিয়ে ৭৫-৮০টি বিমান ওঠানামা করে, গমনাগমন করে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার যাত্রী। এদের বেশির ভাগই স্বল্পশিক্ষিত প্রবাসী শ্রমিক। এসব যাত্রীর জন্য আরো কয়েক হাজার দর্শনার্থী বিমানবন্দরে যাতায়াত করে। এসব যাত্রী ও দর্শনার্থীদের টার্গেট করেই হয়রানি বাণিজ্যের নানা প্রক্রিয়া সচল থাকে।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় লাগেজ পেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। আবার কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লাগেজ পাওয়া যায়নি। গত ৫ বছরে এ ধরনের সহস্রাধিক অভিযোগ রয়েছে লস্ট অ্যান্ড লাউঞ্জ শাখায়। ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ বলেছেন, লাগেজ খোয়া যাওয়া ও লাগেজ কেটে মূল্যবান মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে ব্যবস্থা নিলেও লাগেজ কাটা পার্টির তৎপরতা বন্ধ হয়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলছেন ভিন্ন কথা।
সিভিল অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, যাত্রী হয়রানি ও লাগেজ পেতে বিড়ম্বনা এখন অনেকটা কমে এসেছে। আমরা এরই মধ্যে যাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছি।
তিনি বলেন, এখনো পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অনেকটা কমেছে। আমরা প্রায়ই বিমানবন্দরে গণশুনানি করেও যাত্রীদের কাছ থেকে ও কর্মরত সংস্থাগুলোর সদস্যদের কাছ থেকে অভিযোগ শুনেছি, সমাধানও করেছি। তাদের পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছি। তবে থার্ড টার্মিনাল চালু হলে এ সমস্যা আর থাকবে না। কারণ তখন সবকিছু অটোমেশন ব্যবস্থায় হবে।
চেয়ারম্যান আরো জানান, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলে তখন আর ম্যানুয়ালি কিছুই হবে না। সব হবে অটোমেশন পদ্ধতিতে। অবশ্য এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অটোমেশন পদ্ধতি চালু হলেই হবে না। কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনমানসিকতার উন্নতি প্রয়োজন। যাত্রীদের প্রতি তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।
বিমানবন্দরে কর্মরত এপিবিএনের একজন কর্মকর্তা বলেন, লাগেজ কাটা পার্টি ও লাগেজ চুরি চক্রের সঙ্গে বিমানবন্দরে কর্মরত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। বিশেষ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল অ্যাভিয়েশন ও কাস্টমসের একটি অসাধু সিন্ডিকেট এসব কাজে জড়িত। বিভিন্ন সময়ে এদের বেশ কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরাও হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বিমানের ও সিভিল অ্যাভিয়েশনের লোকজন ছাড়া কেউ লাগেজ কাটা বা চুরি করতে পারবে না। যদিও এখন সিসি ক্যামেরার সাহায্যে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। তারপরও লাগেজ কাটা পার্টি তৎপর রয়েছে। এ অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে এপিবিএন তৎপর রয়েছে। আবার মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। যাত্রী সেবার মান বাড়াতে সিভিল অ্যাভিয়েশনও তৎপর। সিভিল অ্যাভিয়েশন গণশুনানির মাধ্যমে যাত্রীদের অভিযোগ পেয়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার ভোগান্তির শিকার যাত্রীদের সমস্যা সমাধান করেছে।
বিমানবন্দর এলাকায় গত কয়েক দিন সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে যাত্রী হয়রানির নানা বেহালচিত্র লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই ভুক্তভোগী কয়েকজন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নানা অভিযোগ করেন। তবে সামাজিক সম্মান ও পরিচিতির কারণে নিজেদের নামণ্ডঠিকানা প্রকাশ করতে রাজি হননি তারা। বিমানবন্দরে যাত্রীদের আকুতি-মিনতি, অভিযোগের কোনো পাত্তা মেলে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীদের ভাগ্যে জোটে নির্দয় আচরণ। বিমানবন্দরে যাত্রীদের দৈহিক নির্যাতন চালানোর বেশ কয়েকটি ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে।
বিমানবন্দর অভ্যন্তরের অন্তত ১২টি ধাপে যাত্রীদের কাছ থেকে চাহিদামাফিক টাকা হাতানোর ধান্দায় নানা রকম হয়রানি চালানো হয়। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে থাকা ব্যাংকের বুথে মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়েও চরম হয়রানির শিকার হতে হয়। মুদ্রা সংগ্রহে গেলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা নেই। শেষ মুহূর্তে ব্যাংকের আশপাশে অবস্থানকারী অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দেশের মুদ্রা মাত্রাতিরিক্ত দামে সংগ্রহে বাধ্য হন যাত্রীরা। এ্গুলি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অতি সত্তর সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বিমান বন্দর থেকে কর্মচারির সংখ্যা কমিয়ে ফেললেই অনেকটা যাত্রিসেবা বাড়বে।
”