প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬
প্রকাশিত:
মোঃ হুমায়ুন কবির ঃ দ্বিতীয় জুলাই অভ্যুত্থান দিবস আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক নতুন স্বাধীনতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার ও সাংবাদিকদের গণঅভ্যুত্থান ফ্যাসিবাদ সরকারে পতন ঘটিয়েছিল। এই আন্দোলন ছিল বৈষম্যবিরোধী ও দুর্নীতিমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী ও জনগণ কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের দমন-পীড়ন ও নির্বিচার গুলিতে আন্দোলন দ্রুত এক দফার সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ শত শত তরুণের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। হাজারো মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেন। হাজার হাজার ছাত্র জনতা ও সাংবাদিক গ্রেফতার হয়। কিন্তু কেহ রাস্তা ছাড়েনি। এর ফলে স্বৈরাচারী শাসকদল দেশত্যাগে বাধ্য হয় ও ৫ আগস্ট নতুন বিজয় অর্জিত হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের চিরঋণী করেছে। তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে তাদের স্বপ্ন—একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র গঠন—বাস্তবায়ন করাই আমাদের মূল অঙ্গীকার। শহীদদের স্মৃতি অমর হোক।
বিগত ১৬ বছরের নির্যাতিত সাংবাদিকদের মূল্যায়ন ঃ
বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে যে সমস্ত পেশাদার সাংবাদিক সত্য প্রকাশের কারণে চাকরি হারিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন বা অবর্ণনীয় হয়রানি ও মামলার শিকার হয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে, মুক্ত মতপ্রকাশের পথ রুদ্ধ করতে সাংবাদিকদের দমনে ব্যবহৃত ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা সব রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
সাংবাদিক সংগঠন থেকে দলীয় কর্মী ও হাইব্রিডদের বর্জন
পেশাদার সাংবাদিকদের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট দলীয় নোটিশ জারি করা উচিত, যেন কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পদ বা সদস্যপদ দখল করতে না পারেন। দলীয় কর্মীদের দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব ও ফেডারেশনগুলো থেকে দ্রুততম সময়ে ভুয়া ও ছদ্মবেশী ‘হাইব্রিড’ সাংবাদিকদের তালিকা তৈরি করে বাদ দিতে হবে। সাংবাদিকতার পরিবেশকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করতে নীতি হতে হবে স্পষ্ট—যারা প্রকৃত পেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত, কেবল তারাই সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য হবেন, অন্য কেউ নয়। এতে সাংবাদিকদের স্বসম্মান রক্ষা পাবে এবং সত্য তথ্য প্রকাশ অনেক সহজ হবে।
দ্বৈত ভূমিকা ও দালালি বন্ধের আহ্বান ঃ
কোনো সাংবাদিক দুই দিকের সম্পর্ক ঠিক রেখে বাস্তব ঘটনা তুলে ধরতে পারে না। সাংবাদিকদের কেবল এক দিকেই থাকতে হবে—তা হলো সত্য এবং জনগণের পক্ষ। যারা দুই দিকে পা রেখে চলে, তারা সাংবাদিক নয়, দাল্লালে পরিণত হয়। আপনি যদি সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের দিকে তাকান, তবে দেখা যাবে কিছু অসাধু কর্মকর্তা সরকারের কাছ থেকে বেতন নিয়েও বড় বড় দুর্নীতিবাজদের কর্মচারী হয়ে যান। তারা দুর্নীতিবাজদের সাথে সম্পর্ক রেখে বেতনের চেয়ে বেশি ঘুষ নেন। এর ফলে সরকার সঠিক সময়ে সত্য ঘটনা জানতে পারে না এবং রাষ্ট্রকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। ঠিক একইভাবে, যেসব সাংবাদিক রাজনৈতিক দলের পদ পদবী ধারন করে তারাও ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছেন, তারাও সত্য ঘটনা তুলে ধরতে পারে না, এতে সরকারে অপুরোনীয় ক্ষতি হয়। যার প্রমান অতিতের ফ্যাসিস্ট সরকার ও তার সহযোগিতা করার দালাল সাংবাদিকগন। অতিতের ঘটনা স্মরন করে সাংবাদিক সংগঠন থেকে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের চিহ্নিত করে গণমাধ্যম থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করতে হবে।
তথ্য মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর সুদৃষ্টির দাবি ঃ
স্বাধীন গণমাধ্যম গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ।তাই তথ্য মন্ত্রণালয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকে সাংবাদিক পরিবেশ পরিমার্জিত করতে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:
আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা: জুলাই অভ্যুত্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে স্থায়ী পুনর্বাসন এবং আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে।
কালো আইন বাতিল: সাংবাদিকতা ও মুক্ত মতপ্রকাশের পথ রুদ্ধ করে—এমন সব বিতর্কিত ও দমনমূলক আইন সম্পূর্ণ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে।
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সাংবাদিকতার ভেতরে থাকা এই বিশাল ভুল-ত্রুটিগুলো দূর করে একে নতুন করে সাজাতে না পারলে রাষ্ট্র সংস্কারের বাকি সব উদ্যোগ ভেস্তে যাবে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপই পারে সংবাদ মাধ্যমকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও সুশৃঙ্খল করতে।