প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬
প্রকাশিত:
হিমু : বর্তমানে আমাদের সাংবাদিক নেতারা সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণের দোহাই দিয়ে সরকারকে যেসব আইন-কানুন বা বিধিমালা তৈরির তাগিদ দেন, সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ হলে তো প্রথমেই ওই কথিত নেতাদেরই অনেকের ঝরে পড়ার কথা! তাই এসব আইন বা বিধিমালা জারির আগেই তাঁদের উচিত ছিল সৎ ও বিবেকবান হয়ে নিজ নিজ পদ-পদবি ও ‘নেতাগিরি’ থেকে সরে দাঁড়ানো। কিন্তু কোনো সুবিধাবাদী নেতাই তা করবেন না।
অপসাংবাদিকতা বন্ধ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যেসব আইন-কানুন ও নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলা হচ্ছে, তা হয়তো একসময় জারিও হয়ে যাবে। কিন্তু যে মহৎ উদ্দেশ্যে এসব আইন করা হচ্ছে, বাস্তবে তার সামান্যতম সুবিধাও পাওয়া যাবে না। কারণ, এসব আইনের যদি সত্যিকারের নিরপেক্ষ প্রয়োগ হয়, তবে তো নেতাদের চামচামি, তোষামোদ আর পকেটের অবৈধ লেনদেন এক লহমায় বন্ধ হয়ে যাবে! কিন্তু চাটুকারিতা আর উপরি কামাই বন্ধ হলে ওই নেতারা চলবেন কীভাবে?
ফলে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, ফল হবে ঠিক উল্টো। নতুন বিধিমালা জারি হলে আইনের ফাঁকফোকর গলে ওই চাটুকার ও সুবিধাবাদীরাই আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে, আর প্রকৃত নীতিবান সাংবাদিকেরা মূলধারা থেকে আরও দূরে ছিটকে পড়বেন। সুবিধাবাদী নেতারা আইনের নানা মারপ্যাঁচ বুঝিয়ে অবৈধ কামাইয়ের সুযোগ করে দিয়ে অপদার্থ সম্পাদক ও নামধারী সাংবাদিকদের টিকিয়ে রাখবেন; আর এর বলি হয়ে মূলধারার সত্যিকারের সৎ, সাহসী ও বাস্তবমুখী সাংবাদিকেরা এই পেশা থেকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবেন।
এমনকি কোনো নীতিহীন ও অপদার্থ সম্পাদকের পত্রিকায়ও তারা কাজ করবেন না। কারণ, কেবল টাকা থাকলেই ব্যবসা করা যায়, কিন্তু পত্রিকার ব্যবসা বা মালিক হওয়া কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়—এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ! কোনো পত্রিকার সম্পাদক যদি হন অশিক্ষিত, অভদ্র বা সন্ত্রাসী মনোভাবাপন্ন, তবে তাঁর অধীনে কি কোনো সম্মানিত, শিক্ষিত ও স্বনামধন্য সাংবাদিক কাজ করতে পারেন? কখনোই না।
তাই সত্যিকারের সাংবাদিক নেতাদের হতে হবে লোভহীন, সৎ, বিবেকবান এবং সাহসী—যারা পদ-পদবির চেয়ে সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও সাংবাদিকদের প্রকৃত সম্মানকে প্রাধান্য দেবেন।
মানুষের ক্ষুধা, লোভ ও চাহিদা থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের একজন প্রতিনিধি হয়ে যেখানে-সেখানে নীতি বিক্রি করে সুবিধা নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ বর্তমানে একশ্রেণীর সাংবাদিক নেতার চাহিদা ও লোভ এতটাই বেড়ে গেছে যে, তাঁরা যেকোনো জায়গায় আপস করতে দ্বিধা করেন না। নিজেদের পকেট ভারী করতে এবং শিক্ষিত, নীতিবান ও প্রবীণ সাংবাদিকদের মূলধারা থেকে দূরে ঠেলে দিতে তাঁরা রাষ্ট্রের একশ্রেণীর আমলা, এমপি ও মন্ত্রীদের সাথে সুর মিলিয়ে চলেন।
কারণ, তাঁরা তো কোনো যোগ্য বা আদর্শ সম্পাদকের পত্রিকায় কাজ করেন না; কাজ করেন অপদার্থ সম্পাদক কিংবা পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের পোষা সুযোগ সন্ধানীদের পত্রিকায়। মাস শেষে মোটা অঙ্কের টাকা আর সুযোগ-সুবিধাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য; সংবাদপত্রের নীতি কিংবা পেশাগত নৈতিকতার কী হলো—তা দেখার প্রয়োজন তাঁরা বোধ করেন না।
আজ এই কথিত সাংবাদিক নেতারা টাকা ও সুবিধার বিনিময়ে অপদার্থ সম্পাদকদের সমাজের উঁচুদরের আসনে বসিয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই এই অযোগ্য ব্যক্তিরা মন্ত্রী ও আমলাদের দরবার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সাংবাদিকতার ‘স’ না জানলেও এই তোষামোদকারী নেতারা অপদার্থ সম্পাদকদের চাটুকারিতার নানা কৌশল শিখিয়ে দক্ষ করে তুলছেন, যার ফলে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।
সাংবাদিকতার মান ও হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফেরাতে হলে আগে এই সাংবাদিক নেতাদের নিজেদের পদের মর্যাদা বুঝতে হবে। লোভ-লালসা ত্যাগ করে সৎ পথে এবং সততার সাহসে চলতে হবে। সাংবাদিক নেতারা যদি নিজেদের আত্মসম্মান ও নৈতিকতা বজায় রাখতে পারেন, তবেই সাংবাদিক সমাজ সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হয়ে উঠবে—এর জন্য নতুন কোনো কড়াকড়ি আইন বা বিধিমালার প্রয়োজন হবে না।