প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬
হিমু : একজন পুরুষ যেমন কারো সন্তান, আবার কারো জামাই—ঠিক তেমনই একজন সাংবাদিক রাজনীতিবিদদের কাছে জামাইয়ের মতো আর সাংবাদিক জগতে সন্তানের মতো।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সন্তানকে বাবা-মা ২০ থেকে ৩০ বছর লালন-পালন করেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাকরাসহ তাকে আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করেন। আর সেই ছেলেটি বিয়ে করলেই অন্য একজনের জামাই হয়ে যায়! তখন মজার ব্যাপার হয়, সন্তান তো বাবা-মায়ের কাছে সব সময় সমান; যার ফলে সংসারের সাধারণ দিনে যেমনই হোক, তারা সন্তানকে সাধ্যমতো ভাল কাপড় চোপর পরানসহ ভালো মন্দ খাবারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে গেলে নতুন জামাইকে একটু বেশি আদরযত্নসহ ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন। কারণ মেয়ে দিয়েইতো জামাই সম্পর্ক। নতুন জামাই তো ক্ষণিকের জন্য বেড়াতে যান। জামাইকে ভালো খাওয়ালে তিনি মেয়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন এবং শ্বশুর-শাশুড়ির সুনাম করবেন, বদনাম করবেন না—এই ভেবেই জামাইকে জামাই-আদর ও আপ্যায়ন করা হয়।
সাময়িক আদর-যত্ন শ্বশুরবাড়ি থেকে পেয়ে নিজের বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না, সংসারের কাজকর্মের দিকেও কোনো খেয়াল রাখেন না। চালচলনেও একটা ভাব নিয়ে ঘোরেন। একদিন সন্তানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তোমার কী হয়েছে?”
সন্তান বলল, “মা, আপনি তো সব সময় ভালো খাবার ভালো ব্যবহারও করেন না! আমি শ্বশুরবাড়ি গেলে শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আমাকে ‘বাবা’ ছাড়া ডাকেনই না। প্রতি বেলায় খাবারের সময় মাছ, মাংস, ডিমসহ কমপক্ষে দশ রকমের তরকারি রান্না করেন। সকালে ও বিকেলে অনেক ধরনের নাস্তা দেন—যার খাবারের সাথে কোনো কিছুর তুলনাই হয় না! । আমি চিন্তা করছি, এখন থেকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই থাকব।”
মা নীরব থেকে বললেন, “কেন বাবা যাবি? বেশি আদর কিন্তু ভালো না।”
ছেলে বলল, “কী বলো মা! শ্বশুর আমাকে ‘বাবা’ ছাড়া ডাকেনই না!”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে বাবা, ভেবে দেখো কোনটা ভালো লাগে।”
মায়ের কথায় ছেলে কোনো গুরুত্বই দিল না। কয়দিন পর আবার শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তখন মা পেছন থেকে বললেন, “বাবা, কতদিন শ্বশুরবাড়ি থাকবে?”
ছেলে বলল, “অনেক দিন!”
মা এবার বললেন, “কমপক্ষে দু’মাস থেকে এসো।”
ছেলে বলল, “ঠিক আছে মা, এর আগে আসছি না।”
কিন্তু ছেলে বেড়াতে যাওয়ার মাত্র ২০ দিনের মাথায় ঘরে ফিরে এল। তার মুখ একদম শুকনো ও মলিন। মা তো দেখে অবাক! তিনি বললেন, “কী ব্যাপার বাবা? তুই না বললি দু’মাস থাকবি, ২০ দিনের মধ্যেই ফিরে এলি যে? আর মুখটাই বা এত শুকনো কেন? সকালে নাস্তা করে আসিসনি?”
এবার ছেলের মুখে কোনো কথা নেই। ( সাংবাদিকগন যখন সরকারি চাকরি পান তখন গাড়ী বাড়ীও দেয়, আনন্দে হাসে। আর যে দিন বাহির করে দেয় সেদিন, খালি পায়ে পুর্বের স্থানে মলিন মুখে ফিরতে হয় বদনামের বস্তা নিয়ে )
মা-বাবা আবারও বললেন, “তুমি না বললে দু’মাস থাকবে? এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে?”
এবার ছেলে অনুতপ্ত হয়ে বলল, “মা, ১০ দিন পার হওয়ার পর থেকেই ওরা আমাকে দিয়ে বাজার করানো, গরু বাধানোসহ নানান কাজ করাইছে। ওরা আমাকে একটুও শান্তি দেয়নি।মা তোমার কাছে যে শান্তি আর ভালোবাসা তা ওদের কাছে নেই। ওরা আমার সাথে মাত্র ১৫ দিনেই খারাপ আচরণ করা শুরু করেছে।”
মা মুচকি হেসে বললেন, “আমি ৩০ বছরেও যে আচরণ তোমার সাথে করিনি, তা ওরা ১৫ দিনেই করেছে? তোমার জীবন তেতো হয়ে গেছে, তাই না?
রাজনীতি হলো সমসাময়িক শ্বশুরবাড়ির মতো—বাহ্যিকভাবে মধুর মনে হলেও ভেতরে থাকে নানান স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। কারণ, রাজনীতিতে প্রায়শই নানা ধরনের অসৎ কাজ, দুর্নীতি ও অনিয়ম জড়িয়ে থাকে। এসব অপকর্ম ও অনিয়ম ঢেকে রাখতে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজনৈতিক নেতারা সাংবাদিকদের নিজেদের পক্ষে টানতে সবসময় ব্যস্ত থাকেন।
অন্যদিকে, কিছু সাংবাদিকও দ্রুত ও সহজে প্রচুর অর্থ উপার্জন, সমাজে ‘এমপি-মন্ত্রী’ সুলভ ভাব নেওয়া এবং আভিজাত্য বজায় রেখে চলার জন্য রাজনৈতিক সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সারাটা দিন তেল মালিশে ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, সাংবাদিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতাদের দরবারে বসে থাকেন—নেতা ওঠেন না-তো সাংবাদিকরাও উঠেন না। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, তারা সবাই যেন নেতার চাটুকার বা ভৃত্য!
সাংবাদিকরা প্রায়ই ভুলে যান যে, নেতারা মূলত নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই সাংবাদিক সংগঠন ও সাংবাদিকদের কাছে বারবার আসেন। সাংবাদিকদের লেখনী ও মুখ বন্ধ রাখার জন্যই তারা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেন। অনেক সময় রাজনৈতিক পদ কিংবা সরকারি চাকরি বা সুবিধার লোভ দেখিয়ে সাংবাদিকদের আটকে ফেলার চেষ্টা করা হয়, আর কিছু সাংবাদিক না বুঝেই সেই টোপ গিলে ফেলেন।
অথচ চাকরি বা পদ বাগিয়ে নেওয়ার পরই দেখা যায়, সেই সাংবাদিককে-সরকারি কর্মকর্তার বা নেতার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারা বুঝতেও পারেন না যে, এই দাসত্বের কারণে সাংবাদিক হিসেবে তাদের মর্যাদা কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
সাংবাদিকতা একটি স্বাধীন পেশা; এটি স্বাধীন মতামত প্রকাশের মাধ্যম। একজন প্রকৃত সাংবাদিক হবেন বিবেকবান ও সৎ। কিন্তু সেই সাংবাদিকই যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কর্মচারীতে পরিণত হন, তখন তার সততা ও নীতি-নৈতিকতা বিলুপ্ত হয়। একজন সাংবাদিকের পক্ষে কখনোই সত্য ও মিথ্যা দুটিকে একসাথে বজায় রেখে চলা সম্ভব নয়।
রাজনীতিবিদরা সাংবাদিকদের কখনো সত্যিকারে বন্ধু মনে করেন না, কেবল স্বার্থের খাতিরেই কাছে টেনে নেন। আর স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ছুড়ে ফেলতেও দ্বিধা করেন না। সাংবাদিকের চোখে সমাজের সকল স্তরের মানুষ সমান হওয়া উচিত। তাই একই সাথে রাজনীতি ও সাংবাদিকতা—এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না।
যারা সাংবাদিকতা ছেড়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিতে যোগ দেন, তারা তাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সততা হারিয়ে ফেলেন। ফলে কোনো পক্ষেই তারা সঠিক তথ্য তুলে ধরতে পারেন না। আর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে গিয়ে খুব কম মানুষই সুনাম অর্জন করতে পেরেছেন বা স্থায়ী হতে পেরেছেন।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের রক্তের ভেতরে যে সত্য ও বিবেকবোধ থাকে, তা দিয়ে রাজনীতিবিদদের নোংরা এজেন্ডা বা মনমতো কাজ করা সম্ভব নয়। নেওয়ার সময় হয়তো ভাই বলে আদর করে, কিন্তু কাজ শেষে চাকরের মতো ব্যবহার করে। কারণ, সমসাময়িক রাজনীতিতে তোষামোদ আর স্বার্থই মুখ্য—সেখানে বিবেক ও সততার কোনো জায়গা নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী রূপ বদলানোই তাদের মূল খেলা।
সাংবাদিক সমাজ যদি একতাবদ্ধ থাকে এবং অতিরিক্ত লোভ-লালসা পরিহার করে, তবে সব দলের রাজনীতিবিদরাই তাদের সম্মান করতে এবং নম্র আচরণ করতে বাধ্য হবেন। কারণ, সাংবাদিকদের লেখনী ও প্রচার ছাড়া পৃথিবীর কোনো সমাজেই কোনো ব্যক্তি এককভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
অন্যান্য সকল পেশার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বয়সে অবসর নিতে হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্মানহানির আশঙ্কাও থাকে। কিন্তু একজন নীতিবান সাংবাদিকের জীবনে সততার কোনো অবসর নেই, আর নৈতিকতার জায়গায় অটল থাকলে তার সম্মানহানিরও কোনো সুযোগ নেই।
কোনো রাজনীতিবিদ যদি কোনো সাংবাদিককে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেয় বা অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখায়, তবে বুঝতে হবে তার ভেতরে কোনো না কোনো গলদ বা স্বার্থ লুকিয়ে আছে। সেই বাংলা প্রবাদের মতোই—“মায়ের চেয়ে বেশি ভালোবাসলে তাকে ডাইনি বা রাক্ষসী বলে”—কথাটা যে বোঝে তার জন্য তা মহা গুরুত্বপূর্ণ, আর যে না বোঝে তার জন্য মূল্যহীন।
সাংবাদিক পেশাজীবী সংগঠনগুলো থেকে সকল রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের বের করে দেওয়া হোক। একইসাথে, রাজনীতির সক্রিয় পদ পাওয়ার পরও যারা সাংবাদিক সংগঠনের সদস্য আছেন তাদের সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দিয়ে দেয়া উচিত। কারন যখন একজন সাংবাদিক কোন সরকারি পদ পায় তখন সে অন্যসব সাংবাদিকদের ম্ধ্যে কুট চাল –চালতে থাকে! যাকে ভালো লাগে তাকে সরকারি সকল সুযোগ সুবিদা করে দেয়। আর যার সাথে ভালো সম্পর্ক না তার ক্ষতি করে সাংবাদিকদের মধ্যেই বৈষম্যতা সৃষ্টি করে দেয় । এই বৈষম্যর জন্য সরকারের অনেক ব্যপারে মানক্ষুন্ন হতে হয়্। কাজীই সাংবাদিকগনকে কোন সরকারি পদে না নিয়ে রাষ্ট্রের বা সাংবাদিকদের জন্য কোন উন্নয়নের কাজে দরকার হলে সাংবাদিকদের কাজ থেকে পরামর্শ নিয়ে ওটাকে লিপিবদ্ধ করে তার উপর মন্ত্রী এমপিরা বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহন করা অতি উত্তম। সাংবাদিকগন যেভাবে সরকারের পদ পেয়ে তার অপছন্দের সাংবাদিকদের পদমর্যদা থেকে ক্ষতি করেন তেমনি এমপি মন্ত্রীরাও ঐ সব সাংবাদিকদের দ্বাড়া সরকারের কারো কারো নামে মিথ্য বা সত্য ঘটনা প্রকাশ করে আমলাদের মান ক্ষুন্নসহ সরকারেরও মান নষ্ট করে দেয়। এই জন্য দুইটাকে ভিন্ন করে রাখাই সর্বশ্রেষ্ঠ।
তাহলে দেশে সরকার কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও সাংবাদিকতা পেশার অবস্থান ও মানের কোনো অবনতি হবে না। আপনি দেশের সকল দলের কাছে সসম্মানে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারবেন।