প্রকাশিত: অক্টোবর ৭, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক : সংবাদ সম্মেলনে রাকিবুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানান ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ছবি: পুলিশের সৌজন্যে
এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে এক মাস আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসে রাকিবুল ইসলাম (১৭)। ওঠেন শেওড়াপাড়ার একটি মেসে। পূর্বপরিচিত আব্দুল্লাহ আল মামুন (২৫) নামে একজন ফোন করে ডেকে নেওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি এই কিশোর।
পরে পুলিশের তদন্তে জানা যায়, রাজধানীর শুক্রবাদের একটি বাসায় নিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে গুম করতে কার্টনে ভরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারী। সেখানে একটি সুপারি বাগানের ভেতরে লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়। আগে থেকেই মুক্তিপণ আদায় করতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দেওয়া হয় হত্যার হুমকিও। জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা মুক্তিপণের টাকাও দেন।
তারপরও খুঁজে না পেয়ে দুদিন পর ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় রাকিবুল নিখোঁজ হওয়ার তথ্য জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তাঁর বড় ভাই জহিরুল ইসলাম। সেই জিডির সূত্র ধরেই এই হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে কাফরুল থানা পুলিশ।
আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
পুলিশ কর্মকর্তা মহিদুল বলেন, রাকিবুল ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে একটি ফোন আসে। ফোনে কথা বলার পর শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যেতে বলা হয় তাঁকে। সেখান থেকে তাঁকে নেওয়া হয় রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায়। এরপর আর তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।
কাফরুল থানা পুলিশের বরাত দিয়ে মহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্ত শুরু করে পুলিশ জানতে পারে মুক্তিপণ দাবি করে যে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে কল দেওয়া হয়, সেগুলোর ব্যবহারকারী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকার (২৪) নামে একজন। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রাকিবকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলায় একটি সুপারি বাগান থেকে কার্টনে ভরা অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্য উল্লেখ করে মহিদুল ইসলাম বলেন, রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে থাকেন। এর মধ্যে পরিবারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন মামুন। টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যার হুমকি দেন তিনি। মুক্তিপণ আদায় করতে পরিবারকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, রাকিবকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট ৪ লাখ টাকা পাঠান। তারপরও ফিরে না পেয়ে তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। রাকিব খুন হয়েছে জানার পর তিনি অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় আসা রাকিবুল ইসলামকে ডেকে নিয়ে হত্যার ঘটনায় আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ।
হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টার দিকে রাজধানীর শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে মামুনকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন জানান, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঢাকায় আসার পর একাধিকবার রাকিব তাঁর বাসায় যান। তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। সর্বশেষ ১৬ সেপ্টেম্বর বাসায় গেলে তাঁকে মারধর করা হয়। মুক্তিপণের টাকা দিতে চাপ প্রয়োগ করেন। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ঘাড় মটকে রাকিব মারা যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাকিবকে হত্যা করার পর মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে মামুন নিজেই রাকিবের পরিবারের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন। কয়েকটি নম্বর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। টাকা পাওয়ার পর নম্বর বন্ধ করে পালিয়ে যায় মামুন।
কার্টনে ভরে নেওয়া হয় নীলফামারীতে
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাকিব মারা গেলে তাঁর মরদেহ গুম করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মামুন। মরদেহটি একটি কার্টনে ভরে কসটেপ দিয়ে মুড়িয়ে ফেলেন তিনি। এরপর তার বাড়ির দারোয়ানের সহায়তায় কার্টনটি অটোরিকশায় তুলে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। কার্টনটি এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, সেটা দেখে মরদেহ আছে বোঝার উপায় ছিলো না। ফলে ঢাকা থেকে নীলফামারী নেওয়া হলেও কারো সন্দেহ হয়নি।
পুলিশ আরও জানায়, গাবতলী থেকে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়ির এলাকায় যান মামুন। পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের আঁধারে বাড়ির সামনে একটি সুপারি বাগানে গর্ত করেন। পরে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ সেখানে মাটিচাপা দেন।
মহিদুল ইসলাম জানান, মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ডিমলা থানা পুলিশের সহায়তায় ওই সুপারি বাগানে অভিযান চালানো হয়। মামুনের দেখানো স্থান থেকে কার্টনের ভেতরে রাকিবের মরদেহ পাওয়া যায়। পরে তাঁর বড় ভাই জহুরুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
রাকিবের পরিবারের কাছ থেকে মামুন যে চার লাখ টাকা নিয়েছিলেন, সেখান থেকে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মামুন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাওয়ায় তাঁকে আজকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, মুক্তিপণের অর্থের লেনদেন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।