প্রকাশিত: অক্টোবর ৬, ২০২৬
লাইফস্টাইল ডেস্ক : মিষ্টি পানীয় বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোল্ড ড্রিংকস শরীরের জন্য ক্ষতিকর—এ কথা আমরা সবাই জানি। ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ঝুঁকির কথা বহুবার বলা হলেও এবার নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে: অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় কি পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে?
২০২৬ সালে বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘গ্যাস্ট্রো হেপ অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় চিনিযুক্ত পানীয় এবং কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয়ের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে।
ভারতের মুম্বাইয়ের ‘এমওসি ক্যানসার কেয়ার’-এর বিশিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. রূপজ্যোতি শর্মা এই গবেষণার নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কী দেখা গেছে গবেষণায়?
ড. রূপজ্যোতি শর্মা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি গবেষণায় ১,১২,২৮৪ জন মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে ২৭৮ জনের পাকস্থলীর ক্যানসার শনাক্ত হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, যারা মাসে গড়ে একটির কম চিনিযুক্ত পানীয় পান করতেন, তাদের তুলনায় যারা প্রতিদিন অন্তত একটির বেশি মিষ্টি পানীয় পান করতেন, তাদের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল ২.৪৫ গুণ বেশি।
শরীরচর্চা, ধূমপান, মদ্যপান বা ডায়াবেটিসের মতো বিষয়গুলো হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পরও এই ফলাফলে পরিবর্তন হয়নি। তবে ড. রূপজ্যোতি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ গবেষণা। তাই এতে মিষ্টি পানীয়ের সঙ্গে ক্যানসারের একটি সম্পর্ক দেখা গেলেও কোল্ড ড্রিংকস সরাসরি ক্যানসার তৈরি করে—এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা
এটি একটি পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ গবেষণা ছিল। এ ছাড়া এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে:
১. পাকস্থলীর ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ ‘হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি’ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ সম্পর্কিত তথ্য মাত্র অল্প কিছু অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রে পাওয়া গিয়েছিল।
২. বংশগত ইতিহাস বা টিউমারের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না।
৩. গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সিংহভাগই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিক। তাই বিশ্বব্যাপী বা বিশেষ করে এশীয়/উপমহাদেশীয় জনগোষ্ঠীর ওপর এই তথ্য কতটা প্রযোজ্য, তা সরাসরি বলা সম্ভব নয়।
ক্যানসার ও মিষ্টি পানীয়: মূল ঝুঁকিগুলো কী কী?
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. শর্মার মতে, কেবল মিষ্টি পানীয়কেই ক্যানসারের মূল কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এর পেছনে আরও বেশ কয়েকটি বড় ঝুঁকি কাজ করে:
১. এইচ. পাইলোরি সংক্রমণ: পাকস্থলীর ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এইচ. পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ার ক্রনিক সংক্রমণ। সময়মতো এর চিকিৎসা করালে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
২. অতিরিক্ত লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার: অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর উপায়ে সংরক্ষিত খাবার খাওয়া।
৩. অন্যান্য শারীরিক কারণ: বয়স, বংশগত ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান ও ভুল জীবনযাপন।
‘ডায়েট’ বা কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয় কি নিরাপদ?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গবেষণায় কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত পানীয়ের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের এমন কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
তবে ড. রূপজ্যোতি শর্মা সতর্ক করে জানান, ‘এর মানে এই নয় যে ডায়েট ড্রিংকস ক্যানসার প্রতিরোধ করে। কৃত্রিম মিষ্টি নিয়ে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতামত এখনো মিশ্র।
‘ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড’-এর মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর মতে, যেকোনো মিষ্টি পানীয়ের বদলে সবসময় সাধারণ বিশুদ্ধ পানি বা চিনি ছাড়া প্রাকৃতিক পানীয় বেছে নেওয়াই সবচেয়ে উত্তম।’
এ ছাড়া কৃত্রিম মিষ্টি ‘অ্যাস্পারটেম’-কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ বললেও, তা সাধারণ মাত্রায় পান করলে সরাসরি ক্যানসার তৈরি করে—এমন কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো নেই।
চিকিৎসকের পরামর্শ
প্রতিদিন চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় সরাসরি স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও মেটাবলিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়—যা পরোক্ষভাবে শরীরের সার্বিক ক্যানসার ঝুঁকিকেও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই কোল্ড ড্রিংকস বা প্যাকেজজাত জুসের অভ্যাস কমিয়ে দৈনন্দিন জীবনে পানি, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর পানীয় পানের অভ্যাস গড়ে তোলাই শ্রেয়।