প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
হিমু :সাংবাদিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বজুড়ে নির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি একক লোগো বা প্রতীক থাকা এখন সময়ের দাবি। সারা বিশ্বে সাংবাদিকদের কাজের ধরন যেমন এক, তেমনি বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক নির্যাতন, নিপীড়ন, অন্যায়, গুম ও হত্যাকাণ্ডের ধরনও প্রায় একই। এসব অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষা ও পেশাগত সুরক্ষার জন্য সব দেশের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি সুসংগঠিত আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক ঐক্য (যেমন সার্কভুক্ত বা আন্তর্জাতিক সংগঠন) গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একই সাথে, কোনো সাংবাদিক যদি নির্যাতন, দুর্ঘটনা বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং স্থানীয়ভাবে সঠিক বিচার বা মূল্যায়ন না পান, তবে যেন আহত সাংবাদিক বা তাঁর পরিবার সামান্য কোর্ট ফি দিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইতে পারেন—এমন একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আইনি কাঠামোর জোর দাবি জানাচ্ছি।
সাংবাদিকদের জন্য একক কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত লোগো নাই কিন্তুআন্তর্জাতিকভাবে রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত আছে । যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো সাংবাদিকতাকে অন্যতম একটি উচ্চ-মানসিক চাপের পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন, যা আন্তর্জাতিকভাবে রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত এর জন্য আমরা আনন্দিত ।
১. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা (Mental Health Conditions)
যুদ্ধক্ষেত্র, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরাধ কিংবা মানবিক সংকটের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা পরোক্ষভাবে ট্রমার শিকার হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (APA) কর্তৃক স্বীকৃত যেসব মানসিক রোগ সাংবাদিকদের মধ্যে প্রকটভাবে দেখা যায়:
পোস্ট–ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD): যুদ্ধ, সহিংসতা বা লাশের ছবি ও ফুটেজ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে PTSD হওয়ার হার সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
বার্নআউট (Burnout): বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজেস (ICD-11)-এ ‘বার্নআউট’-কে পেশাগত কারণে সৃষ্ট একটি গভীর মানসিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ডেডলাইনের চাপ এবং ছুটির অভাব থেকে এটি হয়।
সেকেন্ডারি ট্রমাটিক স্ট্রেস (Secondary Traumatic Stress): নিজে সরাসরি দুর্ঘটনার শিকার না হয়েও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া বা ট্রমাটিক ভিডিও ফুটেজ বারবার দেখার কারণে সাংবাদিকদের এই মানসিক রোগটি হতে পারে।
অ্যাংজাইটি ও ডিপ্রেশন: তীব্র কাজের চাপ এবং অনিশ্চয়তার কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্লিনিক্যাল বিষণ্ণতা (Depression) ও দুশ্চিন্তাজনিত (Anxiety) রোগের হার বেশি।
২. শারীরিক ও দীর্ঘমেয়াদী রোগ (Physical Health Issues)
অনিয়মিত জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাবারের অভাব এবং দীর্ঘক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করার কারণে সাংবাদিকদের কিছু সাধারণ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়:
হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা/কফি) বা ধূমপানের অভ্যাসের কারণে কার্ডিওভাসকুলার রোগ হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক ও আলসার: নির্দিষ্ট সময়ে খাবার না খাওয়া এবং কাজের উদ্বেগের কারণে পেটের সমস্যা খুব সাধারণ।
ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম (Chronic Fatigue Syndrome): পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে শরীর ও পেশিতে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা ও অবসাদ তৈরি হয়।
সহায়তা ও গবেষণা:
সাংবাদিকদের এই মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ডার্ট সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমা (Dart Center for Journalism & Trauma) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এর মতো সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমগুলোকে সাংবাদিকদের মানসিক সুরক্ষায় বিশেষ কাউন্সিলিং প্রদানের আহ্বানের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সার্বিক সুরক্ষা নিয়ে সার্কভুক্ত বা আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলা ও একটি প্রতিক সৃষ্টি করার জন্যও আহ্বান জানান দরকার।