প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
মো: হুমায়ুন কবির : সংবিধানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন সময় প্রণীত কালো আইনগুলো মূলত সেই অধিকারকেই খর্ব করে। কাগজে-কলমে সাংবাদিকতাকে সম্মান জানানো হলেও, ক্ষমতার স্বার্থে আঘাত লাগলেই প্রথম তিন স্তম্ভের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গ আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে চতুর্থ স্তম্ভকে দুর্বল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, তথ্য গোপন করে বা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে কোনো রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। চতুর্থ স্তম্ভকে অন্ধ করে দিলে বাকি তিন স্তম্ভ নিয়ে গড়ে ওঠা পুরো রাষ্ট্র নামক অট্টালিকাটিই ধসে পড়ে।
আমার জানতে ইচ্ছে করে—আপনারা তিন স্তম্ভ এক হয়ে বারবার কালো আইন করার উদ্যোগ নেন কেন? অথচ সংবিধানে চতুর্থ স্তম্ভকে তো আলাদা উপধারা হিসেবেও সেভাবে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। আপনারা যে ভালো কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক কিংবা সুশাসক—তার প্রমাণ তো এই চতুর্থ স্তম্ভের মাধ্যমেই জনগণের কাছে পৌঁছায়। চতুর্থ স্তম্ভ যদি সম্পূর্ণ চুপ হয়ে যায়, অর্থাৎ সাংবাদিকরা যদি কলম ধরা বন্ধ করে দেন, তবে আপনাদের সকল কর্তৃত্ব ও মাতব্বরি মুহূর্তেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
আপনারা সাংবাদিকদের সবসময় দমন করে রাখতে চান, সর্বদা তাঁদের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে সমালোচনা করেন। আপনারা তিন স্তম্ভ একত্রিত হয়ে চতুর্থ স্তম্ভের ওপর কীভাবে দমন-পীড়ন চালানো যায়, সেই চেষ্টা চালান। কেন এই আচরণ? সাংবাদিকরা কি কেবল আপনাদের খারাপ দিকটাই তুলে ধরেন? আপনাদের ভালো কাজগুলোর কথা কি তাঁরা লেখেন না? তাঁদের কারণেই তো সমাজে আপনারা ‘ভালো রাজনীতিবিদ’, ‘দক্ষ সচিব’ বা ‘সফল মন্ত্রী’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। অথচ আপনারা তাঁদের সমান চোখে দেখতে পারেন না। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের খবর যখন প্রকাশ পেয়ে যায় এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগে, তখনই অহেতুক কালো আইন তৈরি করে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়।
কিন্তু এটি কি আদৌ সঠিক পন্থা? আপনারা ভালো কাজ করছেন নাকি অন্যায় করছেন—কোনোটাই যদি সাংবাদিকরা প্রকাশ না করেন, তবে কি আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারবেন? কখনোই পারবেন না।
অপরদিকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো একটি স্তম্ভ যদি এক সপ্তাহের জন্য কাজ বন্ধ রাখে, তাতে হয়তো সাময়িকভাবে অচলাবস্থা তৈরি হবে কিন্তু রাষ্ট্রের মূল কাঠামো একবারে ভেঙে পড়বে না। কিন্তু চতুর্থ স্তম্ভ যদি এক সপ্তাহ তো দূরের কথা, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার জন্য সব ধরনের সংবাদ পরিবেশন বন্ধ করে দেয়, তবে তথ্যশূন্যতায় পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
সবদিক বিবেচনা করে, বিগত সরকারগুলোর অত্যাচারী রণকৌশল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের ওপর কালো আইনের কুফল পর্যালোচনা করা উচিত। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করতে আপনারা যে ধরনের আইন করার চিন্তা করছেন, তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে—তা ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।
আপনারা তিন স্তম্ভ একত্র হয়ে নিজেদের যত শক্তিশালীই মনে করেন না কেন, সততা ও জবাবদিহিতা না থাকলে আপনারা দুর্বল। ক্ষমতার যে অপব্যবহার আপনারা করেন, সাংবাদিকরা তা করেন না; তাঁরা স্বাধীনভাবে সত্য উদঘাটন ও তা প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। আপনাদের সঙ্গে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা পদবীগত দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু নিজেদের অনিয়ম ঢাকার জন্যই আপনারা চতুর্থ স্তম্ভকে শত্রু মনে করেন। নিজেদের সংশোধন করুন এবং সত্যকে মুখোমুখি করার সাহস অর্জন করুন—তাহলেই সমাজ ও রাষ্ট্র সুন্দর হয়ে উঠবে।