১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার,বিকাল ৪:১৩

শিরোনাম
বৈশাখী ভাতা নিয়ে বড় দুঃসংবাদ পেল সরকারি চাকরিজীবীরা মানবতাবিরোধী অপরাধে জাফর ইকবালসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ চেকপোস্টে ৬ জন গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা-উন্নয়ন নিয়ে হুইপ নিজানের মতবিনিময় সভায় সব দলের প্রতিনিধি গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোনো স্বৈরশক্তিই মাথাচাড়া দিতে পারে না: রিজভী গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, আরও ৯ আসামি কারাগারে জিয়াউর রহমানকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেন কর্নেল মতিউর সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ২৫ কোটি টাকা করা হচ্ছে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী ক্ষমতাবলয়ের অনিয়ম ও ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অপূর্ণ আশা

জাতীয় সংসদের স্পিকারের পর এবার সরকারি কর্মকর্তাদেরকে চোর বলে আখ্যায়িত করেছেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ সম্প্রতি দেশের শীর্ষপর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মুখ থেকে আমলাতন্ত্র ও সরকারি কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে আসা একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য দেশজুড়ে এক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
দুর্নীতি আর আমলাতান্ত্রিক অবক্ষয়ের প্রসঙ্গটি নতুন করে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের বক্তব্যে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও আলোচনার মাঝেই সরকারের নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রীয় পদের শীর্ষ ব্যক্তিদের কাছ থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি ‘চোর’ বা দুর্নীতির কারিগর বলে আখ্যায়িত করার এই ঘটনাগুলো জনমনে ও প্রশাসনিক বলয়ে গভীর এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে, যখন ভোলার তজুমদ্দিনে এক মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত সরাসরি ও কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের অদ্ভুত দেশ, অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। তারা নানা ধরনের ঘুষখোরি ও লুটপাট করে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।
এই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ লক্ষ্মীপুরে এক মতবিনিময় সভায় পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর এক কৌতুকপূর্ণ ও শ্লেষাত্মক মন্তব্যে আমলাতন্ত্রের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি খোলামেলাভাবে বলেন, “রাজনীতিবিদদের কাজ বক্তৃতা দেওয়া আর সরকারি চাকরিজীবীদের কাজ হলো কিছু চুরি করা, কিছু কাজ করা। কর্মকর্তাদের সামনে রেখে মন্ত্রীর আরও মন্তব্য ছিল, দুর্নীতি হলে তা কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই সংগঠিত হবে, যা এক প্রকার সরাসরি প্রশাসনিক দুর্নীতিকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার শামিল। তবে আব্দুল আউয়াল মিন্টু তার এই বক্তব্যের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক প্রশংসিত হচ্ছেন।
পে স্কেলের আগে কেন এই আস্থাহীনতা তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি নতুন ও যুগোপযোগী নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। এই পে স্কেল নিয়ে যখন বিভিন্ন স্তরে প্রশাসনিক ও সরকারি তোড়জোড় ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছে, ঠিক তখনই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের থেকে এমন আক্রমণাত্মক মূল্যায়ন আমলাদের মাঝে গভীর মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বা বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা হিসেবে সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের শর্ত দেওয়া হয়। তবে পে স্কেল দেওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে যখন খোদ স্পিকার এবং মন্ত্রীই তাঁদের অধস্তন প্রশাসনকে ঢালাওভাবে ‘চোর’ বা ‘চুরির ভাগীদার’ বলছেন, তখন এটি ইঙ্গিত করে যে কেবল বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোতেই এক ধরণের কাঠামোগত অবক্ষয় বা গভীর আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।
এই জোড়া মন্তব্য সাধারণ নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ স্পিকার ও মন্ত্রীর এই খোলামেলা ও স্পষ্টভাষী অবস্থানকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন।
জনগণের একাংশের ধারণা, দীর্ঘদিনের লালফিতার দৌরাত্ম্য ও ঘুষ বাণিজ্যের যে বাস্তব চিত্র সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দেখছে, শীর্ষ পদের ব্যক্তিরা কেবল সেই সত্যটাই সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছেন।
তবে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়াও বেশ জোরালো। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ধরণের ঢালাও মন্তব্যে এক ধরনের চাপা অসন্তোষ ও মনঃক্ষুণ্ণ ভাব লক্ষ্য করা গেছে। অনেকের মতে, শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের এমন মন্তব্য সামগ্রিকভাবে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে হয়তো।
রাজনীতিবিদ ও আমলাদের এই পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি আখেরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা।
পে স্কেলের ক্ষণগণনা এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতির মাঝে স্পিকার ও পরিবেশমন্ত্রীর এই বক্তব্যগুলো প্রশাসন ও রাজনীতির ভেতরের এক অস্বস্তিকর সত্যকে উন্মোচিত করেছে। চোর ও চুরির এই অপবাদ কাটিয়ে উঠে কীভাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করবেন এবং সরকার কীভাবে এই তীব্র আস্থাহীনতার সংকটের সমাধান করবে।

  • শেয়ার করুন