প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬
বিশেষ সংবাদদাতা ঃ

চৌধুরী নাফিজ সরাফত ওরফে ডন (দুর্নীতি বরপুত্র) বাড়িঃ গোপালগঞ্জ। সেই সুবাদে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকতেন ‘ফুফু’ বলে। আর আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ‘কাজিন‘ বলে পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও অর্থমন্ত্রী লোটাস কামালকে বানিয়ে ছিলেন তার বাপের ভাই ‘চাচা’। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে নানা দুর্নীতি, জালিয়াতি, অনিয়ম, প্রতারণা ও বাটপারির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন তিনি।
২০০৯ সালের আগে ছিলেন সামান্য একজন চাকরিজীবী। একটি ব্যাংকের সাধারণ কর্মী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেলেন। রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠলেন। মাত্র ১৫ বছরে হয়ে গেলেন কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক। তার অপকর্মের কাহিনি লিখতে গেলে উপাখ্যান হয়ে যাবে। তাই সংক্ষিপ্ত আকারে লেখার চেষ্টা করছি। পরে তার অপরাধের আরও চিত্র তুলে ধরা হবে।
শেখ হাসিনার কাছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আবেগ ও ভালবাসার নাম শেখ রাসেল। ধুরন্ধর নাফিজ সরাফত ‘’শেখ রাসেল শিশু কিশোর জাতীয় পরিষদ” নামে একটা সংগঠন তৈরী করে নিজে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়ে প্রধানমন্ত্রীর সেই দুর্বলতাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। এই সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলে তার মালিকাধীন পত্রিকার প্রথম পাতাসহ আরও দুই/তিন পাতাজুড়ে সেই ছবি ছাপানো হতো। যদিও মাত্র ৫০০ কপি সার্কুলেশনের পত্রিকাটি কোন পাঠকের কাছে না গেলেও ওই বিশেষ সংখ্যাগুলো প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌছানোর ব্যবস্থা করতেন।
চৌধুরী নাফিজ সরাফত ওরফে ডন আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুর্নীতির করতে করতে হয়ে উঠলেন মাফিয়া ডন। তিনি বাটপারিকে এক ধরনের শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। শূন্য থেকে মালিক হন কয়েক হাজার কোটি টাকার। ব্যাংক কর্মচারী থেকে হয়ে গেলেন ব্যাংকের মালিক। ইংরেজি মিডিয়ামে এ লেভেল (উচ্চ মাধ্যমিক সমমান)
পাস করার কিছুদিন পর ১৯৯৯ সালে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে একজন সাধারণ কর্মি হিসাবে চাকরিজীবন শুরু করেন নাফিজ সরাফত ডন। পরবর্তীতে সালমান এফ রহমানের তদবিরে যোগ দেন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে। হন কনজুমার ব্যাংকিংয়ের ইউনিটিটের প্রধান। ভিজিটিং কার্ডে তিনি নিজের পরিচয় ‘এমডি, কনজুমার ব্যাংকিং,
আইসিবি গ্লোবাল হোল্ডিংস’ ব্যবহার করতেন, যা ছিল সম্পুর্ন ভুয়া। শুধু তাই নয়, ধুরন্ধর এই নাফিজ সরাফত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বলে জানা না গেলেও নিজেকে ‘ডক্টরেট’ বলে পরিচয় দেন।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন খাতের অন্যতম প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন নাফিজ সরাফত। শুরুতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন। এই মখা আলমগীরের মাধ্যমেই তার উত্থান শুরু। পরে আবার মখা আলমগীরের সঙ্গেই করেন প্রতারণা। কায়দা করে হাতিয়ে নেন ফারমার্স ব্যাংক। হয়ে যান চেয়ারম্যান। ব্যাংকের নাম বদলে রাখেন পদ্মা ব্যাংক। এরপর জালিয়াতি করে গ্রাহকের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আগে থেকেই ভঙ্গুর এই ব্যাংকটিকে দেউলিয়া করে দেন এই মাফিয়া ডন।
এই ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে ‘ফুপু’ বলে সম্বোধনের পাশাপাশি সরকারের প্রভাবশালী অনেককেই চাচা, মামা, খালু, কাজিন বানিয়ে ফেলতেন। বিভিন্ন মহলে তাদেরকে আত্মিয় বলে পরিচয় দিতেন। অথচ তার পিতা সরাফাত চৌধুরীর সঙ্গে এদের চৌদ্দ জনমেও কোন আত্মীয়তা নাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাফত চৌধুরী একজন রাজাকার ছিলেন। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। উল্লেখ্য, মাত্র তিন পুরুষ আগে হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া এই পরিবারের সাথে গোপালগঞ্জের কেউ আত্মীয়তা করতো না। নাফিজ সরাফতের প্রপিতামহ অর্থাৎ সরাফত চৌধুরীর দাদা তার তিন শিশুপুত্রসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
সালমান এফ রহমান, তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার এবং সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতের সঙ্গে নাফিজ সরাফতের সম্পর্কের কথা ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের প্রায় সবারই জানা। এই কারনে নাফিজ সরাফত চেয়েছেন কিন্তু হয়নি, পুঁজিবাজারে এমন ঘটনা নেই। পুঁজিবাজার জালিয়াতির অন্যতম হোতা এই ডন! তার কারণে হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ফকির হয়ে গেছে। ক্ষমতার পালাবদলের পর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশী সুবিধাভোগী নাফিজ সরাফাতের বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়। প্রাথমিক ভাবে তার বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লোপাটের মাধ্যমে ৮৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমান পাওয়া গেছে।
মাত্র ১৩/১৪ বছরে ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ, তারকা হোটেল, মোবাইল টাওয়ার কোম্পানি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যমসহ আরও কিছু খাতে অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান নাফিজ সরাফত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চৌধুরী নাফিজ সরাফত ছিলেন বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি, আর সেই প্রভাব তিনি খাটিয়েছেন নানা ক্ষেত্রে; এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও বিস্ময়কর ভাবে তার স্বার্থ রক্ষা করে গেছে। আর্থিক খাতের অনিয়মে বারবার নাফিজ সরাফাতের নাম এলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নামে বেনামে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ডন কোম্পানির অংশীদারত্ব নিয়েছেন। কখনো অর্থের বিনিময়ে, কখনো ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।হাজারো অনিয়ম করলেও তাকে স্পর্শ করা যেত না। অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হলে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানো হত।
২০২০ সালে কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোরের আঁকা একটি কার্টুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তোলে। চৌধুরী নাফিজ সরাফাতকে চিত্রায়িত করা ওই কার্টুনে নাভির জায়গায় দেখা যায় ব্যাংকের প্রতীক সিন্দুকের হাতল। তাতে ক্যাপশন ছিল, “আমি চৌ নাফিজ সারাফাত/জানি ব্যাংক খাওয়ার ধারাপাত!”কিশোরের আঁকা ওই কার্টুনের উপরের ক্যাপশনটি লিখেছিলেন
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মুশতাক আহমেদ। ফেসবুকে এই কার্টুন আঁকার অপরাধে ২০২০ সালের মে মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদ। আটকের পর তাঁদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এরপর ৫ মে তাঁদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সে সময় ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ছয়বার তাঁদের জামিনের আবেদন নাকচ হয়ে যায়। আটক অবস্থায় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে মুশতাক আহমেদ মারা যান। মূলত কার্টুন আঁকার কারণে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দিয়ে কিশোর ও মুশতাককে অমানুষিক নির্যাতন করিয়েছিলেন নাফিজ সরাফত। মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় সে সময় শোক ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্য ও কানাডার হাইকমিশনার। কিন্তু রহস্যজনক কারণে মুশতাক হত্যার দায়ে নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হয় নাই।
ইতিমধ্যে নাফিজ সরাফাতের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলায় নাফিজ সরাফাতের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদ, ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরীকেও আসামি করা হয়েছে।
সিআইডি সুত্রে জানা গেছে, নাফিজ সরাফাত ও তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহীদের মালিকানায় কানাডায় দুটি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি এবং আঞ্জুমান আরা শহীদের নামে সিঙ্গাপুরে একটি কোম্পানির
১৫টি যৌথ হিসাব রয়েছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। এ ছাড়া নাফিজ সরাফতের ছেলে রাহীব সাফওয়ান সারাফাত চৌধুরীর নামে কানাডা, সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৭৬টি হিসাব পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। দুবাইয়ে নাফিজ সরাফাতের তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাট ও পাঁচ কক্ষের একটি ভিলা রয়েছে। এছাড়া ৫২টি কোম্পানিতে তার বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। ইতিপূর্বে নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের বাড়ি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ১৮টি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছে আদালত।
দেশে জঙ্গী আন্দোলনের ফলে ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের পটপরিবর্তনের পরে এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ ও নিজেকে রক্ষার নিমিত্তে তিনি এক বিএনপি নেতাকে নতুন পীর ধরেছেন। তার পিছনে প্রচুর বিনিয়োগ করছেন জনশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু এই বাটপার নাফিজ সবই করছেন নিজের স্বার্থে, তা ওই নেতা বুঝতে পারলে তারও মঙ্গল, দেশেরও মঙ্গল। কেননা, এই জাতীয় অপরাধীর বিচার হওয়া সকলেরই দাবী।
( তথ্যসূত্রঃ সাংবাদিক Farazi Azmal Hossain ভাই )