২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার,রাত ২:৩১

রেলওয়েতে ফজলে করিমের ‘দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য’: ১১ কোটির কাজ ৩৬ কোটিতে, যন্ত্রাংশের দাম বাড়ল ২০০ গুণ

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি ঃ
বাংলাদেশ রেলওয়ে যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক অনন্য উদাহরণ। বছরের পর বছর ধরে এখানে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গড়ে তুলেছেন এক দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য। আর এই রাজত্বের একক নিয়ন্ত্রক বা ‘একচ্ছত্র রাজা’ হিসেবে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী। তার হাত ধরেই রেলওয়েতে লুটপাট ও অনিয়ম এক চরম শিখরে পৌঁছেছে।

ক্ষমতার বলয় পারিবারিক সিন্ডিকেট
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর টানা তিন মেয়াদে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান ফজলে করিম। এই দীর্ঘ সময়কালকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের প্রধান হাতিয়ার ছিলেন তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ও শ্যালক খান মোহাম্মাদ এহসান। সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ও নুরুল ইসলাম সুজনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তিনি হয়ে ওঠেন অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

দরপত্র জালিয়াতি কর্মকর্তাদের হেনস্তা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফজলে করিম চৌধুরী কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ক্ষমতার জোরে বড় বড় প্রজেক্ট হাতিয়ে নিতেন। প্রতিযোগিতাহীনভাবে যন্ত্রাংশের মূল্য কয়েকশ গুণ বাড়িয়ে বিল আদায় করতে তিনি রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ওপর অমানবিক চাপ সৃষ্টি করতেন। তার অবাস্তব ও অন্যায্য আবদার না মানলে কর্মকর্তাদের অপমান-অপদস্ত করা হতো। একদিকে সৎ কর্মকর্তারা হয়রানির শিকার হলেও, তার অনুগত পদ-পদবি লোভী কর্মকর্তারা পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কার।

৩৬ কোটিরঅকেজোওয়াশিং প্ল্যান্ট
রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামানকে ব্ল্যাকমেইল করে ৩৬ কোটি টাকা মূল্যের ‘ডিজিটাল ওয়াশিং প্ল্যান্ট’ স্থাপনের কাজ আদায় করে নেন ফজলে করিম। ঢাকা ও রাজশাহীতে স্থাপিত এই ওয়াশিং প্ল্যান্ট দুটি উদ্বোধনের পর এক দিনের জন্যও রেলের কোনো কাজে আসেনি। জানা গেছে, ইতালীয় একটি কোম্পানির মাধ্যমে মাত্র ১১ কোটি টাকায় এই কাজ করার প্রস্তাব নিয়ে এক ব্যবসায়ী এগোলেও ফজলে করিম ও তৎকালীন রেলমন্ত্রীর হুমকির মুখে তিনি সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

বিদেশে ১০০ ডলারের যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে লাখ টাকা!
ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম ও শ্যালক এহসানের প্রতিষ্ঠান ‘নেক্সট জেনারেশন গ্রাফিক্স লিমিটেড’ (Next Generation Graphics Ltd) ভারতীয় কোম্পানি ‘এলিক্সার ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে রেলওয়েতে নতুন জাল বিস্তার করে। ট্রেনের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ক্রয়ে তারা সূক্ষ্ম জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। দেখা গেছে, ইন্ডিয়ান রেলওয়ে যে সেন্সর ডিভাইস ১০-২০ হাজার রুপিতে (প্রায় ২০০ ডলার) কেনে, বাংলাদেশ রেলওয়ে তা একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ২ থেকে ৪ লাখ টাকায় ক্রয় করেছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের এক ভয়াবহ অপচয় করা হয়েছে।

মেক্সিমাম সাপোর্ট ভারতীয় প্রজেক্টে ভাগ বসানো
২০১৮ সাল থেকে ফজলে করিমের মালিকানাধীন ‘মেক্সিমাম সাপোর্ট লিমিটেড’ (Maximum Support Limited) রেলের কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘ইরকন’-এর মাধ্যমে রেল সিগনালিং ও ব্রিজ নির্মাণের শত শত কোটি টাকার প্রজেক্ট বাগিয়ে নেয়। এসব কাজেও গুণগত মান ও স্বচ্ছতার চরম অভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সচেতন মহলের দাবি
রেলওয়ের এই সীমাহীন অনিয়ম ও লুটপাট বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের সচেতন মহল। তারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে কঠোর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ফজলে করিম চৌধুরীর নামে-বেনামে থাকা সব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে দ্রুত ‘কালো-তালিকাভুক্ত’ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

 

  • শেয়ার করুন