৯ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার,বিকাল ৩:২৩

শিরোনাম
দিল্লির বৈঠকে শেখ হাসিনা-কামালকে ফেরত চাইল বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবনের দস্যু তৎপরতা দমনে যৌথ অভিযান শুরু রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের লালমনিরহাট ডিভিশনে দুই কর্মকর্তার রদবদল ও বদলি বিলের আলোচনায় বিসিবিকে ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’ বললেন হাসনাত চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে জ্বালানি ও ভোজ্যতেল মজুত ঠেকাতে যৌথ অভিযান ভাঙচুর চালানো মানুষগুলোই চাইছেন হাসপাতালটি চালু হোক তিন ক্রিকেটার, মন্ত্রীর ৩ ছেলে আর প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী যাত্রী কল্যান সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেলের সংগঠনের আড়ালে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজি ও অবৈধভাবে সিএনজির ব্যবসা ডিএনসিসির কাউন্সিলর শফিকুলের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন

নাঙ্গলকোটে তিন সহোদর দাদন কারবারে সর্বস্বান্ত শত শত পরিবার

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার পেরিয়া ইউনিয়নের কাকৈরতলা এলাকায় বাচ্চু মিয়া মেম্বার, মিজান মিয়া ও আমান উল্লাহ নামের তিন সহোদরের সুদ বা দাদন কারবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার। স্থানীয়ভাবে “সুদি ভাই” নামে পরিচিত এই তিনজনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। তাদের কার্যক্রমের ফলে অনেকে জমিজমা, গবাদিপশু এমনকি বসতভিটাও হারিয়েছেন।

সরেজমিন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের করুণ চিত্র
১. কাকৈরতলার আবুল বশর বুশ
বাচ্চু মিয়ার কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে পর্যায়ক্রমে নিজের প্রায় ৪ বিঘা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন। এখন জীবিকার জন্য তার একমাত্র ছেলে ড্রাইভিং করছে।

২. মুন্সিবসড়ির সাইফুল ইসলাম
একটি তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে কাকৈরতলা বাজারে তাকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

৩. খন্দকার আবুল হোসেন
সুদ না নেওয়ার পরও শুধুমাত্র অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সারাদিন বাজারে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে মুক্তি পান। সালিশে প্রমাণ হয়, তিনি কারও কাছ থেকে টাকা নেননি।

৪. ঐতিহাসিক ঈদগাঁর বিলুপ্তি
তিন সহোদরের সন্ত্রাসী প্রভাবের কারণে কাকৈরতলার ৬০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঈদগাঁ ভেঙে যায়। আগে যেখানে ৫ গ্রামের মানুষ একত্রে ঈদের নামাজ পড়তেন, এখন আলাদা আলাদা জামাত হয়।

৫. ওহাব মিয়া
সুদের টাকা দিতে না পারায় বাচ্চু মিয়া তার টিনের ঘর খুলে নিয়ে যান।

৬. নুরু পাগলার স্ত্রী
জমি লিখে নিতে বাধ্য করা হয় বাচ্চু মিয়ার নামে।

৭. মৃত আবদুল হালেম ও হেবু মিয়ার পরিবার
জমাকৃত ১ লাখ টাকা আত্মসাৎ, বিধবা স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতন এবং বলদ জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

৮. আবুল কালাম মজুমদার (বড়সাঙ্গীশ্বর)
গরু নিয়ে যায় বাচ্চু মিয়া, সুদের অর্থ না দিতে পারায়।

৯. মাওলানা সিহাব (কলমিয়া)
জমা রাখা ৫ লাখ টাকা সুদসহ আদায় করে প্রভাব খাটিয়ে।

১০. মৃত আবদুল মালেক (কাদবা)
রিকশাচালক মালেকের বসতভিটা লিখে নেয়া হয়।

১১. মোয়াজ্জেম হোসেন (বড়সাঙ্গীশ্বর)
সুদের টাকা না পেয়ে জমি লিখে নেয়া হয়।

১২. মাহবুবুল হক ড্রাইভার
বাজারে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ।

১৩. ওমর ফারুক (কাকৈরতলা)
বাজারের একটি দোকান বাচ্চু মিয়ার নামে লিখে নিতে বাধ্য করা হয়।

স্থানীয়দের দাবি, এ রকম আরও শত শত ঘটনা রয়েছে, যা মুখে মুখে প্রচলিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী জানান, ওই তিন ভাইয়ের ঘরে অভিযান চালালে পাওয়া যাবে বিপুল সংখ্যক ব্ল্যাংক স্টাম্প ও ব্ল্যাংক চেক।

একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ
২০১৫ সালে কাকৈরতলার ইদু মিয়ার ১৪ বছর বয়সী ছেলে শাহিন হত্যাকাণ্ডের সাথেও এদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, মামলার মূল আসামি ওয়ার্কশপ মালিক মিজানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।

অভিযুক্তদের বক্তব্য
বাচ্চু মেম্বার বলেন, “যে ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, তাকে আমার সামনে আনুন। আমি ফোনে কথা বলতে চাই না।”
মিজান মিয়া বলেন, “আমাদের সম্মান নষ্ট করার জন্য যারা এসব বলছে, তাদের নাম বলুন। আমরা কিছুই করিনি।”
আমান উল্লাহ বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ হয়েছিল, কিন্তু কেউ প্রমাণ দিতে পারেনি। বিভ্রান্ত করবেন না।”

আইনজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিদের মতামত
সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট পারভেজ হোসেন বলেন, “দাদন বা সুদি ব্যবসা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা গ্রাম আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।”

এডভোকেট বদিউল আলম সুজন বলেন, “ব্ল্যাংক চেক বা ব্ল্যাংক স্টাম্প রাখা আমলযোগ্য অপরাধ। এসব নিতে হলে লিখিত চুক্তি আবশ্যক। ক্ষতিগ্রস্তরা সরাসরি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।”

স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির মজুমদার বলেন, “সুদ ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় উভয় দিক থেকেই অপরাধ। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

লাঙ্গলকোট থানার ওসি আবদুর নুর বলেন, “এই ধরনের সমাজবিধ্বংসী কার্যক্রম নির্মূলে কেউ অভিযোগ করলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও কলেজ অধ্যক্ষ সাদেক হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “সুদের কারবার সমাজের রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। কঠোর আইন প্রয়োগ ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।”

 

  • শেয়ার করুন