৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার,রাত ৪:৫২

ডেপুটি রেঞ্জার এস এম আনিচুর রহমান ২ কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০০ একর প্যারাবন ধ্বংস করছে !

প্রকাশিত: মার্চ ২, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ

সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে উপকূল রক্ষা করার কথা থাকলেও, চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ এখন পরিণত হয়েছে এক অদম্য দুর্নীতির আখড়ায়। ডিএফও থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাসবার যোগসাজশে সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে কোনো কাজ না করেই। তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়া, ভুয়া বিল ভাউচার এবংপ্রাইজ পোস্টিংবাণিজ্যের মাধ্যমে এখানে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট।দুর্নীতির এই মরণব্যাধি ডালপালা মেলতে শুরু করে সাবেক ডিএফও আব্দুর রহমানের সময়কাল থেকে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন গোরাকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা (বর্তমানে ডেপুটি রেঞ্জার) এস এম আনিচুর রহমান প্রায় কোটি টাকার বিনিময়ে ১০০০ একর প্যারাবন ধ্বংসের সুযোগ করে দেন।

এই ঘটনা জাতীয় গণমাধ্যম ও টেলিভিশনে চাঞ্চল্যকর ক্রাইম নিউজ হিসেবে প্রচারিত হলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান আনিচুর রহমান। সূত্র মতে, ডিএফও আব্দুর রহমান মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ করে আনিচুর রহমানকে বাঁচাতে একজন নিরপরাধ ফরেস্ট গার্ডকে বলির পাঁঠা বানিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করেন। উল্টো আনিচুর রহমানকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অত্যন্ত লাভজনক বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হিসেবে পরিচিত ধূমঘাট চেক স্টেশনে বদলি করা হয়।

​আনিচুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও তৎকালীন কুতুবদিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: শামীম রেজা, ফরেস্টার বর্তমানে ডেপুটি রেঞ্জার দুর্নীতির নতুন রেকর্ড গড়েন।

​২০২১-২২ অর্থবছর: মাচাং টাইপ ব্যারাক মেরামতের নামে ১৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। ভুয়া বিল দাখিল করে পুরো টাকা ডিএফওর সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। ​২০২২-২৩ অর্থবছর: ডিএফও বেলায়েত হোসেনের সময়কালে মাটি ভরাট ও অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণের ১০ লক্ষ টাকা একইভাবে আত্মসাৎ করা হয়। শামীম রেজাকে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বদলি করা হয়। তার উত্তরসূরি মো: আব্দুর রাজ্জাক একাধিক অনিয়ম তুলে ধরে ডিএফওর কাছে রিপোর্ট দিলেও শামীম রেজার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জানা যায় বন সংরক্ষক ও ডিএফও মিলে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়ে বর্তমানে শামীম রেজাকে ধূমঘাট চেক স্টেশনে বদলি করেছেন।

মীরসরাই রেঞ্জের সাবেক ডেপুটি রেঞ্জার মো: আব্দুল গফুর মোল্লা যেন দুর্নীতির বরপুত্র। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ‘সুফল’ প্রকল্পের অধীনে ১২০.০ হেক্টর বাগান সৃজনের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা কোনো কাজ না করেই পকেটেস্থ করেছেন তিনি। এমনকি পূর্বের আর্থিক সালের অনেক বাগান ২০২২ সালে সাগরে বিলিন হয়ে গেলেও রিপোর্ট দাখিল না করে ২০২২ সালের পরে সেই সকল বাগানের রক্ষণাবেক্ষণ ও পাহারাদার বাবদ প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার ভূয়া বিল ভাউচার করে আত্মসাৎ করেছেন। ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম কর্তৃক ৩০% চারার উপস্থিতি দেখালেও ডিএফও ৫০%  টাকা নিয়ে শূন্য বাগানে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ২০ লক্ষ টাকা প্রদান করেছেন।

এসিএফ শেখ আবুল কালাম আজাদের তদন্তে বাগানে মাত্র ৬% ও ১৩% চারার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও আব্দুল গফুর মোল্লার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাকে বিতর্কিত বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিমের দপ্তরে সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে এবং পেয়েছে পদোন্নতি।

পুরনোদের পথ ধরে নতুনরাও পিছিয়ে নেই। বাঁশখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল হাসান রাসেল, ফরেস্ট রেঞ্জার চাকরিতে যোগ দিয়েই অনিয়মে জড়িয়েছেন। সুফল প্রকল্পের আওতায় ৬০.০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন তিনি। ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বিভাগের প্রতিবেদনে বাগানে চারার উপস্থিতি মাত্র ৩৪% ও ৫৪% পাওয়া গেলেও তাকে শাস্তি না দিয়ে উল্টো ‘পুরস্কার’ হিসেবে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বদলি করা হয়েছে।

​অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই পুরো দুর্নীতির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন ডিএফও এস এম হাসান এবং বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম। তাদের ছত্রছায়ায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান ডিএফও এস এম হাসান পূর্বসূরিদের দেখানো পথেই হাঁটছেন। একের পর এক জালিয়াতি ও চুরির ঘটনা তদন্তের বদলে তিনি কর্মকর্তাদের রক্ষায় বেশি তৎপর টাকার বিনিময়ে । এমনকি প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে দুর্নীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে এই সিন্ডিকেটের হাত অনেক লম্বা। ​উপকূলীয় বন বিভাগের এই লুটপাটের ফলে একদিকে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম উপকূল। এই বনখেকো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

  • শেয়ার করুন