২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার,রাত ৪:২৯

মোল্যা রেজাউল করিম বন বিভাগে চাকরির পুর্বেই অসৎ ও দুর্নীতিবাজ ছিলেন।

প্রকাশিত: মার্চ ১, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিনিধি ঃ

 মোল্যা রেজাউল করিম ওস্বৈরাচারী রানী

গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর মোল্যা রেজাউল করিম সুকৌশলে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে বন সংরক্ষক চট্টগ্রাম অঞ্চলের পদটি বাগিয়ে নেন। গত বছরের আগস্ট মাসে তার বদলি হলেও ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিএফ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে বনবিভাগে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক ডিভিশনে মত বিনিময় সভার নামে ঘুষ আদায়ের পদ্ধতিগত সভার আয়োজন করেন। মোল্যা সাহেব এর সভাপতিত্বে এই সভাগুলো সম্পন্ন হয়। সভায় তিনি মাননীয় উপদেষ্টা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এর বন বিভাগের একমাত্র শুভাকাংক্ষী দাবী করেন এবং প্রতিদিন উপদেষ্টা ৩/৪ বার মোবাইলে যোগাযোগ করেন বলে সকলকে অবগত করেন, যাতে সকলেই মোল্লাকে ভয় পান। চট্টগ্রাম সার্কেলের সিএফ হতে ৩ কোটি টাকা সম্মানী প্রদান করা হয়েছে মর্মে সে প্রত্যেক ডিভিশনের ডিএফও সাহেবদেরকে টাকা প্রদান করতে বাধ্য করেন। প্রাথমিকভাবে প্রত্যেকে ডিভিশন থেকে টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন আব্দুর রহমান, ডিএফও, আব্দুল্লাহ আল মামুন ডিএফও এবং জয়নাল আবেদীন, সহকারী বন সংরক্ষক, আবদুল হামিদ, ফরেস্টার, মামুন মিয়াঁ, ফরেস্টার। প্রাথমিকভাবে ১ কোটি টাকা মোল্যাকে প্রদান করা হয়।

মোল্লা রেজাউল করীম বন বিভাগে চাকুরির পূর্বে লক্ষীপুরের রামগতি উপজেলা সমাজসেবা অফিসার হিসেবে চাকুরিতে কর্মরত ছিলেন জানা যায় মোল্যা রেজাউল করীম সেখানে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার অধিক টাকা আত্মসাৎ করে চাকুরি ছেড়ে দেন।

গত ২০০৩ সালে আওয়ামী লীগ কোটায় ২২তম বিসিএসের মাধ্যমে বন বিভাগে তার আগমন ঘটে। প্রথম দায়িত্ব হিসাবে পান রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল কাপ্তাই রেঞ্জে। কাপ্তাই রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় শুরু হয় তার দুর্নীতি। তৎকালীন কাপ্তাই রেঞ্জের অধিকাংশ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সেগুন গাছ পাচার হয় মোল্যা রেজাউল করিমের প্রশিক্ষণকালীন।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন কাপ্তাই এলাকায় দায়িত্বে নিয়োজিত সহকারী বন সংরক্ষক শাহাবুদ্দিন রেঞ্জ কর্মকর্তা মোল্যা রেজাউলের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করায় সহকারী বন সংরক্ষকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ারও নজির রয়েছে।

সংরক্ষিত বন ধ্বংস করে টাকার পাহাড় গড়েন মোল্যা। শুরু হয় মোল্যার দুর্নীতি আর পোস্টিং বাণিজ্যের কারবার। ফেনী ডিভিশনে দায়িত্বে থাকাকালীন বাগান সৃজন ও ইকোপার্ক প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করায় তৎকালীন সিসিএফ ইউনুস এই মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দাখিল এবং চাকরিচ্যুতির প্রস্তাবও দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের তদবিরে তিনি পার পেয়ে যান।

রাজশাহী বনবিভাগে ডিএফওর দায়িত্ব পালনকালে সরকারি গাড়ির মিটার রিডিং পরিবর্তন করে তেলের টাকা আত্মসাতের ঘটনাও বনবিভাগের লোকের মুখে মুখে।

আওয়ামী সরকারের সাবেক বনমন্ত্রী হাসান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মন্ত্রণালয় থেকে সেই চাকরিচ্যুতির প্রস্তাব গায়েব করেন এই মোল্যা।

সূত্র বলছে, বাগেরহাট ডিভিশনের দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাবেক বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মাধ্যমে পিরোজপুর এলাকায় ইকোপার্ক করার জন্য মোটা অংকের টাকার প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে কোটি কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা ও আত্মসাৎ করেন। এই কাজের বড় একটা অংশ সাবেক বনমন্ত্রীর স্ত্রীকেও দেওয়া হয়। যার কারণে পরে সাবেক বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর স্ত্রীর অনুরোধে তাকে পুরস্কার হিসেবে বান্দরবানে পাল্পউড বাগান বিভাগে পদায়ন ও বদলি করা হয়। বান্দরবানে যোগদান করে অবৈধ জোত পারমিট প্রদানসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসে মেতে উঠেন। অবৈধ জোত পারমিটের আড়ালে লাখ লাখ ঘনফুট কাঠ সংরক্ষিত বনাঞ্চল হতে পাচার করা হয়।

তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে মোল্যা রেজাউল করিম ঢাকা মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালনকালেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।

অভিযোগের তথ্য মতে, বান্দরবান পাল্পউড ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে দুর্নীতির টাকা দিয়ে ঢাকার ধানমন্ডিতে কোটি টাকা ব্যয়ে ফ্ল্যাট তৈরি করেন। বাসার আসবাবপত্রসহ দরজা বন্দরবানের সংরক্ষিত বনের কাঠে তৈরি।

তথ্য মতে, মোল্যা রেজাউল করিম যশোর সার্কেলে বন সংরক্ষকের দায়িত্ব পালনকালে বন্দরবানে সহযোগিতাকারী ফরেস্টার মোঃ সিরাজুল ইসলামকে যশোর সার্কেলে বদলি করে নিয়ে যান। সেখানেও সামাজিক বনায়নের লটের কাঠের গড় নিলাম মূল্য কম দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। মোল্যা রেজাউল করিম যশোর সার্কেলের সিএফ থাকাকালীন সাবেক বনপ্রতি মন্ত্রী হাবিবুন নাহারকে মা সম্বোধন করতেন। হাবিবুর নাহারকে মা ডাকার সুবাধে মোল্যা রেজাউল করিম সিএফকে বদলি করা হয় সবচেয়ে লাভজনক সার্কেল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা প্রকৃতি সংরক্ষণ সার্কেল ঢাকায়। সেখানে যোগদানের পর বনের জমি বিক্রিসহ নানান অপকর্ম করায় এলাকার অতিষ্ঠ হয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে মোল্যা রেজাউল করিমকে বনমন্ত্রী বদলি করতে বাধ্য হন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এত অনিয়ম, দুর্নীতি, সুবিধাভোগ করার পরও মোল্যা রেজাউল করিম নিজেকে বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন।

তথ্য বলছে, মোল্লা রেজাউল করিম চট্টগ্রাম অঞ্চলে যোগদান করে প্রত্যেক বনবিভাগে মতবিনিময় সভার নামে ঘুষ আদায়ের পদ্ধতিগত সভার অয়োজন করেন। ওই সভাগুলোতে অনেক বনকর্মীকে গালমন্দ করার নজিরও রয়েছে। চট্টগ্রাম সার্কেলের সিএফ হতে ৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে ডিভিশনের ডিএফওদেরকে টাকা দিতে করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্রত্যেকে বিভাগীয় (ডিভিশন) অফিস থেকে টাকা আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন ডিএফও আব্দুর রহমান, ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুন, সহকারী বন সংরক্ষক জয়নাল আবেদীন, ফরেস্টার আবদুল হামিদ, পদুয়া চেক স্টেশনের ফরেস্টার মামুন মিয়া, সহকারী বন সংরক্ষক শীতল পাল ও ফরেস্টার গাজি শফিউল। প্রাথমিকভাবে প্রতি ডিভিশন থেকে ১ কোটি টাকা মোল্যাকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

তবে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মারুফ হোসেন দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম এক কোটি টাকা দেওয়া ক্যাশিয়ার নিয়োগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

বনবিভাগের সূত্র একাধিক জানিয়েছে, গত জানুয়ারি মোল্যা রেজাউল করিম পোস্টিং বাণিজ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিভিশনে কর্মরত ২৬ জন ফরেস্টার, ৩৭ জন ফরেস্ট গার্ড, ৩১৩ জন নৌকা চালকসহ মোট ৭৬ জনকে বদলি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্লা রেজাউল করিমের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পোস্টিংয়ের বিষয়ে এবং ক্যাশিয়ার নিয়োগের বিষয়ে আপনারা তদন্ত করেন।

কোনো বাণিজ্য হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিকড় গেড়ে বসে আছে, তারা বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এসেছিল। তারা এখন বিভিন্ন রকমের বিপর্যয়ের মধ্যে আছে, তারা বিগত সরকারের আমলে বিনিয়োগ করে এসে পোস্টিং নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, এখন রাষ্ট্র সংস্কার করা দরকার। অনেক তাজা রক্তের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে, দেশটাকে ভালোর দিকে নিয়ে গেছে। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর সরকার আমাকে কায়েমি স্বার্থবাদীদের সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি পোস্টিং বাণিজ্য চিরতরে নির্মূল করতে চাই। ( চলবে )

  • শেয়ার করুন