প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৫

মুঈন ঃ
কফি আজ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। প্রতিদিন প্রায় দুই বিলিয়ন কাপ কফি বিশ্বজুড়ে পান করা হয়। সকালে মন সতেজ করা, কাজের সময় জেগে থাকা, কিংবা একান্তে কিছু সময় কাটানোর জন্য—কফি এখন আধুনিক জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। তবে এই কফির যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে আফ্রিকার এক ছোট অঞ্চলে।
ধারণা করা হয়, কফির উৎপত্তি ইথিওপিয়াতে। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, নবম শতাব্দীতে কালদি নামের এক ছাগল পালক লক্ষ্য করেন, তার ছাগলগুলো একটি বিশেষ গাছের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে। কৌতূহলবশত তিনিও ফলগুলো খান এবং দেখেন যে তিনিও উদ্যমী হয়ে উঠেছেন। যদিও এটি একটি কিংবদন্তি, ইথিওপিয়াকেই কফির জন্মস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৫শ“ শতকে কফি রেড সি পাড়ি দিয়ে ইয়েমেনে পৌঁছে। এখানেই প্রথম কফি চাষ ও পানীয় হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। ইয়েমেনের সুফি সাধুরা রাতের দীর্ঘ নামাজের সময় জেগে থাকতে ও মনোযোগ ধরে রাখতে কফি পান করতেন। “কাহওয়া (Qahwa)” —যার অর্থ ‘উদ্দীপক পানীয়’— ছিল কফির প্রাচীন নাম।
১৬শ“ শতকের মধ্যে কফি ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য, মিশর, সিরিয়া ও তুরস্কে। সেখানে কফিহাউস বা কফি ঘর গড়ে ওঠে, যা পরিচিত ছিল “Schools of the Wise” নামে। মানুষ এখানে কেবল কফি পান করত না, বরং সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, কবিতা ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করত। ফলে কফি হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ ও সংস্কৃতির প্রতীক।
১৭শ“ শতকে কফি প্রবেশ করে ইউরোপে। লন্ডনে প্রথম কফি হাউস খোলা হয় ১৬৫২ সালে। ১৭০০ সালের শুরুর দিকে লন্ডনে ছিল দুই হাজারেরও বেশি কফিহাউস, যা পরিচিত ছিল “Penny Universities” নামে— কারণ মাত্র এক পেনিতে কফি পান করে বুদ্ধিদীপ্ত আলাপচারিতায় অংশ নেওয়া যেত।
কফি উপনিবেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে আমেরিকায় পৌঁছে। ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া কফি চাষের জন্য আদর্শ ছিল। ধীরে ধীরে ব্রাজিল হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম কফি উৎপাদক দেশ। ১৮শ শতক থেকে আজ পর্যন্ত ব্রাজিল প্রতি বছর প্রায় ২.৬৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন কফি উৎপাদন করে আসছে।
আধুনিক যুগে রোস্টিং প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াকরণের উন্নতির ফলে কফি শিল্পে বিপ্লব ঘটে। ২০শ শতকের মাঝামাঝি ইনস্ট্যান্ট কফি আবিষ্কারের মাধ্যমে কফি আরও সহজলভ্য হয়। পরে, ২০শ শতকের শেষভাগে “Specialty Coffee Movement” শুরু হয়, যেখানে উচ্চমানের বীজ, ন্যায্য মজুরি, নৈতিক চাষাবাদ ও শিল্পমানের ব্রিউয়িং পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কফি তখন আর শুধু পানীয় নয়—একটি শিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে রূপ নেয়।
১৬৭০ সালে, বাবা বুদান ইয়েমেন থেকে সাতটি কফি বীজ নিয়ে ভারতে আসেন এবং দক্ষিণ ভারতের পাহাড়ে তা রোপণ করেন। বর্তমানে ভারতের মধ্যে কর্ণাটক সবচেয়ে বড় কফি উৎপাদক রাজ্য, এরপরেই রয়েছে কেরালা।
বিশ্বজুড়ে এখন স্টারবাকস সবচেয়ে প্রভাবশালী কফি ব্র্যান্ড, আর যুক্তরাষ্ট্র কফি বাজারে সর্বাধিক আয় করে।
আজ কফি কেবল একটি পানীয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবনধারা ও সামাজিক যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি কফির কাপে রয়েছে শতাব্দীর ইতিহাস, ভ্রমণ, বাণিজ্য ও মানবসম্পর্কের গল্প।
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ
বিষয় ঃ তথ্য
সবচেয়ে প্রচলিত কফির ধরন ঃআরাবিকা (Arabica) ও রবুস্তা (Robusta)
দৈনিক বৈশ্বিক কফি পান ঃপ্রায় ২ বিলিয়ন কাপ
বিশ্বের ২য় বৃহত্তম বাণিজ্য পণ্য ঃকফি (তেলের পর)
ঐতিহাসিক কফি রপ্তানি কেন্দ্র ঃমোচা বন্দর, ইয়েমেন