প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬
বিশেষ প্রতিনিধি :
নদীপথে জলদস্যুদের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা। সন্ধ্যা নামলেই নদীপথে আতঙ্ক বাড়ে। যাত্রীবাহী ট্রলার, জেলেনৌকা, পণ্যবাহী কার্গো, বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযানে হামলা ও অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধ ঠেকাতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন নৌ পুলিশের সদস্যরাও।
স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে। এতে নদীকেন্দ্রিক অপরাধ বাড়ছে।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদীপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে নৌ পুলিশ। এসব অঞ্চলে হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র, চোরাই পণ্য বহন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ২০২৪ সালে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে মামলা হয় ৩ হাজার ৩৯৯টি। এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি ( ২০২৬ ) থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর ঘটনায় হয়েছে আরও ৫০৫টি মামলা। আগের দুই বছরের উল্লিখিত সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের ৯ মাসের এই ৫ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯।
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন। গুলিতে আহত হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে। তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার বাঘার হাওলা গ্রামে।
নৌ পুলিশ জানায়, ওই রাতে জেলেদের ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা করে একদল জলদস্যু। জেলেরা প্রতিহত করতে চাইলে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় ওই এলাকার জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পাঁচ জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথে ডাকাত ও জলদস্যুরা জেলেদের নৌকা এবং যাত্রীবাহী নৌযানে হামলা চালায়। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। জেলেদের হতাহত করে টাকা, মালামাল ও মাছ লুট করা হয়। এতে জেলে, নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকেন।
পণ্যবাহী নৌযানেও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। নৌযানে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডও নদীপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর সংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা নেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, এভাবে সারা দেশের নদীর বিভিন্ন স্থানে টোলের নামে নৌযান থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহন নামের বাল্কহেডের শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়।খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযানে গেলে তাঁদের ওপরও টেঁটা ও বল্লম নিয়ে হামলা করে চাঁদাবাজেরা। এতে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চাঁদাবাজি ঠেকাতে মামলা ও সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. রেজাউল করিম বলেন, নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলেও কেউ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে সাক্ষ্য না থাকায় আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গিয়েও হামলার মুখে পড়ছে নৌ পুলিশ। ২১ এপ্রিল ২০২৬ দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর এলাকাঘেঁষা পদ্মা নদীতে এমন অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য।
মো. রেজাউল করিম বলেন, নদীপথে অভিযান চালিয়ে মাদকদ্রব্যসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাঁদের তথ্য নিয়ে ডেটাবেজ করা হয়েছে। ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
নৌ পুলিশের অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলে মামলা ছিল ৮৫০টি। পরের বছর তা বেড়ে হয় ২ হাজার ১৭টি। দুই বছরই মামলার সংখ্যায় এরপর ছিল বরিশাল অঞ্চল। সেখানে মামলা ৪৪৮ থেকে বেড়ে হয় ৬১১টি।
উল্লেখিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে ১৮২, ঢাকায় ১২০, ফরিদপুরে ১১৩, নারায়ণগঞ্জে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, সিলেটে ৫৮, কিশোরগঞ্জে ৪৯, টাঙ্গাইলে ৩৫ ও খুলনায় ৩৪টি মামলা হয়।
২০২৫ সালে ফরিদপুরে ১৪৭, ঢাকায় ১২৮, রাজশাহীতে ১২১, চট্টগ্রামে ১১৮, নারায়ণগঞ্জে ৯১, টাঙ্গাইলে ৬৬, সিলেটে ৪৫, কিশোরগঞ্জে ৩০ ও খুলনায় ২৫টি মামলা হয়। অর্থাৎ চাঁদপুর ও বরিশালের পাশাপাশি ফরিদপুর, ঢাকা, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলে মামলা বেড়েছে। কমেছে নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, খুলনা ও সিলেটে।
চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যু—এই পাঁচ শ্রেণির মামলায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যা ঢাকা অঞ্চলে, ৮৬টি। এরপর নারায়ণগঞ্জে ৮২টি। এ ছাড়া বরিশাল ও রাজশাহীতে ৭০টি করে, ফরিদপুরে ৫৭টি, টাঙ্গাইলে ৩২টি, খুলনায় ৩০টি; চট্টগ্রাম ও কিশোরগঞ্জে ২৫টি করে, চাঁদপুরে ২২টি এবং সিলেটে ৬টি মামলা হয়েছে। তবে এই হিসাবের সঙ্গে আগের দুই বছরের সব শ্রেণির মামলার সরাসরি তুলনা করা যায় না।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌপথে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। বিশাল এই জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নৌ পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নৌ পুলিশের প্রধান বলেন, দেশের নদীসংলগ্ন এলাকায় নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি রয়েছে। এসব ফাঁড়ির সদস্যরা নদীতে টহল দিয়ে অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে।
এই অপরাধবিশেষজ্ঞের মতে, নৌ পুলিশের কাজ শুধু নদীতে পাহারা দেওয়া নয়; অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও তত্ত্বাবধান বাড়াতে হবে। এ জন্য জনবল, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ করে বাহিনীকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অপরাধপ্রবণ স্থান শনাক্ত করে সেখানে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান চালিয়ে অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।