প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবদক ঃ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেড’ ও এর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ‘লাল মিয়া’ নামে এক ব্যক্তি লিখিতভাবে এই অভিযোগ দায়ের করেন। পাশাপাশি কপি পাঠানো হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা/প্রধানমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী এবং সচিবের দপ্তরগুলোতে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব ও কমিশনের বিনিময়ে কাজটি বাগিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। তাদের অনিয়ম ও অপচয়ের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জমির ও গাছের মালিকেরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ নিয়ে প্রশ্ন ঃ–
প্রকল্প এলাকার ভুক্তভোগীদের অন্যতম অভিযোগ, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য গাছ কাটার বিপরীতে বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়নি।
লাল মিয়া অভিযোগে জানান, প্রতি কিলোমিটারে গাছ কাটার ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকে। সেই হিসাবে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ২,৪৭,৫০,০০০ (দুই কোটি সাতচল্লিশ লাখ ৫০ হাজার) টাকা। কিন্তু এই বড় অঙ্কের টাকাটাই গরিব অসহায় মানুষদের না দিয়ে অমৃক সিংয়ের সহকারী বাংলাদেশী শাহরিয়ারের মাধ্যেমে ট্রান্সরেইল লাইটিং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আত্মসাৎ করেছেন। যার ফলে জমি ও গাছের প্রকৃত মালিকগণ কোনো অর্থ পাননি। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফুলচান, মো. নবী, সুমা আক্তার, আদুরীসহ শত শত মানুষের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ট্রান্সরেইল লাইটিং প্রতিষ্ঠানটি। আরও অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও জমির মালিকদের যথাযথ অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তাঁদের দাবি, এ খাতে বরাদ্দ অর্থেরও চরম অনিয়ম হয়েছে। এ ব্যপারে শাহরিয়ার মুঠো ফোনে একাধীকবার ও তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে তার মতামত পাওয়া যায়নি।
টাওয়ার নির্মাণের মান নিয়েও অভিযোগঃ—
দুদকে দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার নির্মাণের কারিগরি মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, টাওয়ার স্থাপনের জন্য যেখানে প্রায় ২০ ফুট গভীর পাইলিং করার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ ফুটের বেশি পাইলিং করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় কম নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো স্থানে প্রায় ২০০ বস্তা সিমেন্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ বস্তার মতো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তবে পাইলিংয়ের গভীরতা, সিমেন্ট ও রডের পরিমাণসহ এসব বিষয় প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, বিল অব কোয়ান্টিটি (BoQ) এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, নির্মাণকাজে কারিগরি মান বজায় না থাকলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ঃ-
দুদকে অভিযোগ: প্রকল্পটি সরকারি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে গাছ কাটা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ায় তখন অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে তাঁরা আশাবাদী ছিলেন না।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ট্রান্সরেইল লাইটিংয়ের কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের দেশত্যাগ এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বা সম্পর্কের বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগেরও নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার অভিযোগ
প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না করার অভিযোগও করা হয় ট্রান্সরেইল লাইটিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য এই সঞ্চালন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল সময়সূচি অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ২০২৩ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিটে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কথা ছিল।
এই সঞ্চালন অবকাঠামোর অংশ হিসেবে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ সিঙ্গেল-সার্কিট ৪০০ কেভি লাইন এবং যমুনা নদীর ওপর প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-সার্কিট ৪০০ কেভি ও ৭ কিলোমিটার ২৩০ কেভি লাইন নির্মাণের জন্য ভারতীয় কোম্পানি ট্রান্সরেল লাইটিংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়, যার চুক্তিমূল্য ছিল ৫২৪ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬,২৮৮ কোটি টাকা)।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে গ্রিড লাইনের কাজ সম্পন্ন করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের মান, সময়সীমা এবং চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত অংশের নির্মাণকাজ সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ‘এফ আর ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ফরিদের বিরুদ্ধেও নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে জাকির নামে এক ব্যক্তি ফোনে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কাজটি তাঁদের মালিকানাধীন এফ আর ইঞ্জিনিয়ারিং বাস্তবায়ন করছে। একই ব্যক্তি কখনো নিজেকে ‘আমার বার্তা’ পত্রিকার সম্পাদকের ছোট ভাই, কখনো প্রকাশক, আবার কখনো প্রকাশকের ভাই বলে পরিচয় দেন। এছাড়া তিনি একজন এমপির ভাগ্নে বলেও পরিচয় দিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার হুমকি দেন। তবে তাঁর এই পরিচয়ের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি –
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গাছ ও জমির ক্ষতিপূরণ, নির্মাণকাজের মান, প্রকল্পের অর্থব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ এবং কাজের সময়সীমা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম হয়েছে।
তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তদন্তে অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা ক্ষতিপূরণ দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
দুদক: দুদকের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। নথিপত্র, প্রকল্পের চুক্তি, অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের হিসাব, ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং নির্মাণকাজের মান পর্যালোচনা করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।