প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬
এম এ হালিম ঢালী ঃ ১৯৬২ সালের গোড়ারদিকে নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার গোদনাইলের (বার্মশীল ও এস ও রোড) এলাকা দিয়ে প্রবহমান শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেষে মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপো নির্মাণ হয়েছিলো।
নদী ও সড়ক পথের সুবিধা বিবেচনা করে তৎকালীন সরকার এই বৃহত্তর ডিপোটি নির্মাণ করেন।
একই সালে আমেরিকান কোম্পানি ‘Esso Eastern Inc.’ হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই ডিপোটি তাদের দখলে নিয়ে সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করে। পাক হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনের লক্ষ্য নিয়ে এ ক্যাম্পের ভিতরে ভারি ভারি অস্ত্র মজুদ করে। শত্রু বিমান ধ্বংস করতে এয়ার এন্টিক্রাফ্ট (বিমান বিধ্বংসী কামান) ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বসায় পাক হানাদার বাহিনী। এছাড়াও ট্যাংকসহ বিভিন্ন ছোট বড় মারণাস্ত্র মোতায়েন ও গোলাবারুদ এনে জমা করতে থাকে এ ডিপোতে। পাক-হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য গঠন করা হয় রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস নামের নিকৃষ্ট বাহিনী। যাদের কাজ ছিলো স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে হানাদারদের হাতে তুলে দেওয়া। শত-শত বাঙালি সুন্দরী নারীদের ধরে এনে পশুতুল্য পাক বাহিনীর কাছে তুলে দিতো তারা।
১৯৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে বাঙালীদের উপর হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও নারীদের ধর্ষণ।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর রাত থেকে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীর বিমান হামলা। মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্র বাহিনীর শুরু হয় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সাড়াশি আক্রমণ।
৩ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশের প্রথম গোপন বিমান হামলা ‘অপারেশন কিলো ফ্লাইট’ পরিচালিত হয়। এই অভিযানে বীর মুক্তিযোদ্ধা স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার থেকে গোদনাইল তেলের ডিপো লক্ষ্য করে ১৪টি রকেট নিক্ষেপ করেন। এতে তেলের ডিপো ও ট্যাংকারে মজুদ রাখা জ্বালানি ভস্মীভূত ও ধ্বংস হয়ে যায়। এই হামলার পর পাকিস্তানি বাহিনীর মূল জ্বালানি রিজার্ভের বড় অংশ বিস্ফোরিত হয়ে পুড়ে গেলে হানাদার বাহিনীর জ্বালানি সংকট ও সকল প্রকার কার্যক্রম এবং যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরপর হানাদার বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। মুক্তি বাহিনীর স্থল হামলা ও বিমান বাহিনীর উপর্যুপরি বোমাবর্ষণে দিশেহারা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের চুড়ান্ত বিজয়ের একদিন আগেই অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনী সবকিছু ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয়ের পর শত-শত মুক্তিযোদ্ধারা ডিপো পরিদর্শনে এসে দেখতে পান বিশাল গণকবর। যে কবরে মুক্তিকামী বাঙালীদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
গোদনাইলের মেঘনা তেল ডিপোতে পাক হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করার পর ডিপোর আশেপাশের বিশাল এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে। এ অঞ্চলের নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী জীবন ও সভ্রম বাঁচাতে নিরাদ আশ্রয়ের জন্য গ্রামের বাড়ি এবং অনেকে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
নরপিশাচ হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস বাঙালি নিধন ও শত-শত নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করে গণকবরে চাপা দেয়। সেই বিভিশীখাময় দিনগুলোর ইতিহাস নিয়ে আজও মেঘনা তেল ডিপো ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ স্বাধীনের পর স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বগাথা অবদানের জন্য বীরউত্তম খেতাব পান। পরবর্তীতে এয়ার ভাইস মার্শাল ও বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্তি পান সুলতান মাহমুদ বীর উত্তম।
এই জন্যই গোদনাইলের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপোটি ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো জানেনা গোদনাইলের মেঘনা তেল ডিপোর সেই কালোদিনের ইতিহাস। তাই তাদের অবগতির জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে এই ইতিহাসটুকু তুলে ধরলাম প্রতিবেদনে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার গোদনাইলে অবস্থিত মেঘনা তেল ডিপোটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে চলেছে। এর গুরুত্ব অপরিসীম।
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প কারখানার উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখতে মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপোটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এর অধীনস্থ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গোদনাইলের মেঘনা পেট্রোলিয়াম (পিএলসি) ডিপো।
বিশাল এই তেল ডিপো থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার তেল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী গোদনাইল ডিপো থেকে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জসহ ১৫টি জেলা ও অঞ্চলে তেল সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও এই ডিপো থেকে অগভীর নৌ রুটে বা ট্যাংকারের মাধ্যমে বাঘাবাড়ি ও চিলমারী ডিপো অঞ্চলেও তেল পাঠানো হয়।
মোট কথা গোদনাইল তেল ডিপোটি দেশের একটি বিরাট অংশের মেইল-ফ্যাক্টরি, কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস ও নৌপথের শিপ, লঞ্চ-স্টিমারসহ সড়ক পথের যানবাহন সচল রেখে চলেছে। নিয়মিত পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই ডিপোর বর্তমান ম্যানেজম্যান্ট অত্যন্ত ধক্ষ্য ও দায়িত্বশীল। পূর্বে এ ডিপোটির অনেক বদনাম ছিলো। চোরাপথে তেল বিক্রি, ওজনে কম দেওয়া ও সিন্ডিকেট লালনসহ নানারকমের অভিযোগ ছিলো।
বর্তমান ডিপোটির ম্যানেজার বা ইনচার্জ মাহবুবর রহমান সকল অনিয়ম, দুর্নীতি দুর ও সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
গোদনাইলের মেঘনা ডিপোটি এখন দেশ ও জাতির কল্যাণে ২৪ ঘন্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
তবে ডিপোর কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তা হলো রাস্তা। ডিপোর আশেপাশের রাস্তাগুলো ভেঙ্গেচুড়ে খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে জনসাধারণ ও গাড়িগুলোর চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
রাস্তার এই করুণ দশা থেকে মুক্তির জন্য দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।