প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. বাচ্চু মিয়ার নামে ঘুষ ,দুর্নীতির ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সুত্রে জানা গেছে, তিনি নির্বাহী পদে বসতে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ৫ কোটি টাকা। পদে বসার পর অল্প দিনের মধ্যেই ২২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
রং বদলায়, সভাব বদলায় না: প্রকৌশলী বাচ্চুর চরিত্র সম্পর্কে সহকর্মীরা বলেন, “তিনি রং বদলান ঠিকই, চরিত্র বদলান না।” তিনি পোষাক পাল্টান,বোল পাল্টান না” কখনও ক্ষমতাসীন দলে, কখনও বিরোধী দলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি প্রভাব বিস্তার করে ঘুষ দুর্নীতির অপোকৌশল ধরে রেখেছেন ।এই যায়গা থেকে কখনো তিনি বিন্দুমাত্রও সরেননি। অপর দিকে তিনি অবৈধ টাকার গরমে অপক্ষমতা বিস্তার করে যা-ইচ্ছা তা-করেছেন।সরকারী কর্মকর্তা হয়ে আর এক সরকারী কর্মকর্তার উপরেও প্রভাব বিস্তার করতে দ্বিধাবোধ করেনি। জনৈক ইউএনওকে অনিয়মভাবে বদলী করান এবং নিজ দপ্তরেরও সহকর্মীদের ওপরতো অব্যহতই রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বদলি বা শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছেন বার বার নিজে থেকেই।
ভুয়া বিল থেকে মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল পর্যন্ত: শুধু ভুয়া বিল বা বাউচার তৈরি নয়, বাচ্চুর রয়েছে মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করার দক্ষতাও। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি পূর্বে দলীয় অর্থের জোগানদাতা ছিলেন। বর্তমানে তিনি নিজ দপ্তরের অনেকের কাছেই ‘বিষফোড়া কর্মকর্তা’ হিসেবে পরিচিত।
স্ত্রীর নামে বিলাসবহুল সম্পদ: অভিযোগ রয়েছে, বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী আসমা পারভীনের নামে রয়েছে উত্তরা, সেক্টর–১১–তে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, গাজীপুরের নিশাদনগর ও জয়দেবপুরে বাড়ি, পূর্বাচলে একটি প্লট এবং (ঢাকা মেট্রো–গ–৩৫–২৯৫২) নম্বরের একটি বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের নামে বেনামি সম্পদ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা রয়েছে।
অগ্রিম বিল ও দুদকের অভিযান: রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে কাজ সম্পন্ন না করেই অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং নবাবগঞ্জে ইছামতী নদীর ওপর ২৭০ মিটার সেতু নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে দুদক অভিযান পরিচালনা করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুদকের একটি দল আগারগাঁওয়ে এলজিইডি ঢাকা জেলা কার্যালয়ে অভিযান চালায়। অভিযানে নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়।দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, মিরপুরের গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবনের দুইতলার কাজ সম্পন্ন হলেও চারতলার বিল প্রদান করা হয়েছে। দুদক প্রাথমিকভাবে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে এবং অতিরিক্ত রেকর্ড চেয়ে নিয়েছে।
ঘুষের নতুন রেট নির্ধারণ:
প্রকৌশল খাতে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না— এটা পুরনো কথা। তবে এখন ঘুষের হার বেড়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, আগে বিল উত্তোলনে দিতে হতো ৫% কমিশন, এখন তা বেড়ে ৬ থেকে ১০% পযন্ত হয়েছে। আর কাজ না করেই অগ্রিম বিল তুলতে হলে দিতে হয় ৪০% ঘুষ।দুদকের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, বাচ্চু মিয়া ৬৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল দিয়েছেন। এর মধ্যে তিনি নিজের ভাগ হিসেবে নিয়েছেন প্রায় ২২ কোটি টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে।
সেতু মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিম: দুদকের অভিযানের পর সেতু মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি টেকনিক্যাল টিম গঠন করেছে। আহ্বায়ক: মো. ইউসূফ হারুন, নির্বাহী প্রকৌশলী (সেতু), বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সদস্য সচিব: মোসা. তাসলিমা খাতুন, সহকারী প্রকৌশলী, সদস্য: মো. বুলবুল আহমেদ, সহকারী প্রকৌশলী (সড়ক) এই টিম ইছামতী সেতু প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পের অগ্রগতি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করবে।
সরকারি চাকুরে না দলীয় ক্যাডার? বাচ্চু মিয়ার জন্ম গাজীপুরের টঙ্গি এলাকায়। তার মা ছিলেন জাতীয় পার্টির নেত্রী। তবে তিনি সময় ও সুযোগ বুঝে দল পাল্টেছেন— বিএনপি আমলে বিএনপি সমর্থক, আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামীপন্থী হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’–এর সদস্য হয়েছেন। ক্ষমতার প্রভাবে তিনি এক ইউএনওকে বদলি করান, সহকর্মী প্রকৌশলীদের মারধর করেন এবং ভুয়া প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেন। নেত্রকোনা, পাবনা, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় ভুয়া বিল, এলসিএস শ্রমিকদের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিভাগীয় ব্যবস্থা ও নতুন তদন্ত: গত বছর নেত্রকোনায় কর্মরত অবস্থায় বাচ্চু মিয়া এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করে তদবির বাণিজ্য করেন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তদন্ত করে ৩০০ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকৌশলীর তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করে। পরে ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট খাজা মহিউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি এবং ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর শিকদার হোসেন নামে আরেক ব্যক্তি দুর্নীতির অভিযোগে দুদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।দুদকের সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় বলেন,অভিযানের সময় আংশিক রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি নথি সংগ্রহ শেষে কমিশনে প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
স্বৈরাচারি সরকারের আমল থেকেই ঘুষ ও দুর্নীতির শীর্ষে প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়ার নামে অভিযোগের পাহাড় ছিল কিন্তু তখন তার বিরুদ্ধে কেহ কথা বলতে সাহস পায়নি।তার ঘুষ দুর্নীতি ও অনিয়ম এটা কোন নতুন নয়। তবে এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের টেকনিক্যাল টিমের অনুসন্ধান তার অপকৌশলের প্রভাবে কিছুটা হলেও আঘাত দিতে পেরেছে বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগিরা।