৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার,সকাল ৬:৪১

প্রকল্প পরিচালক ডিসিসিএফ গোবিন্দ বন বিভাগের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ও লীগের দোসর হয়েও বহাল !

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

প্রকল্প পরিচালক এবং উপপ্রধান বন সংরক্ষক গোবিন্দ রায়

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ বাংলাদেশ বন বিভাগের আওতায়  প্রকল্প টেকসই বন ও জীবীকা (সুফল) প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা ঘুষ পার্সেন্টেজ, বাগান না করে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাটের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটলেও দেখার কেউ নেই।  সুফল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং উপপ্রধান বন সংরক্ষক গোবিন্দ রায়এর বিরুদ্ধে শতাধিক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হলেও বেশীরভাগ লিখিত অভিযোগ মন্ত্রনালয়, দুদক, প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয়ের ডেসপাচ শাখা থেকে পয়সার বিনিময়ে হয়ে গেছে বেমালুম গায়েব।  তদন্তের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে তাও তদন্তের নামে হয়েছে আই ওয়াশ। ফলে প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায়সহ  সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষক, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ কর্মকর্তাগন এ প্রকল্প থেকে যে যেভাবে পেরেছেন লুটপাটের মাধ্যমে অবৈধ উপার্জিত টাকা নিয়েও রয়েছেন বহাল তবিয়তে।

বন অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে ১৫০২ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ রেখে এই মেগা প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু করা হলেও পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংক সময় ও বরাদ্ধ বাড়ানো প্রেক্ষিতে মোট বরাদ্ধের পরিমান দাড়ায় ১৬৪২ কোটি টাকা। বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রনাধীন ২০টি বন বিভাগে এই প্রকল্পের কার্যক্রম চালালেও সবচেয়ে বেশী লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বন সার্কেলের ৫টি বন বিভাগে। এই ৫টি বন বিভাগের প্রতিটি রেঞ্জেই সুফল বাগান করার জন্য বরাদ্ধকৃত টাকার সিংহভাগ হয়েছে লুটপাট। রেঞ্জ অফিসার, এসিএফ, ডিএফও, সিএফ প্রত্যেকেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিলাস বহুল বাড়ী ফ্ল্যাট গাড়ী করে আনন্দে জীবনযাপন করছেন। এই প্রকল্পের লুটপাট  বিগত স্বৈরাচারি  সরকারের আমলের গৃহিত ৫৪ টি প্রকল্পের মধ্যে  শীর্ষ দুর্নীতিতে নাম ধারন করেছে।

প্রকল্পের আরডিপিপি অনুযায়ী আবর্তক ব্যায় হিসেবে বেতন ও ভাতা, সরবরাহ ও সেবা, মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন, সম্পদ সংগ্রহ ও ক্রয়, বনায়ন কার্যক্রম, পূর্ত কাজ, সমবায় ঋন -এলডিএফ, প্রভৃতি খাতে এই ১৬৪২ কোটি টাকা ব্যায় দেখানো হয়েছে।এই হিসাবেই শত শত  কোটি টাকার  উপরে ভুয়া বিল ভাউচার করে  তারা দলবদ্ধভাবে সরকারে টাকা আত্মসাৎ করেছে বলেই অভিযোগ রয়েছে।

 

প্রকল্পটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও প্রকল্পের এলাকায় বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয় বর্ধক কাজের সৃষ্টি করা। বন ও রক্ষিত এলাকা সংলগ্ন ৬০০টি গ্রামে ৪০ হাজার বন নির্ভর পরিবারের উন্নয়ন করা। ৫২ হাজার ৭২০ হেক্টর বৃক্ষশূন্য পাহাড়ী ও সমতল বনভূমিতে  বনাচ্ছাদন, নতুন জেগে ওঠা চরে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন করা, ২০টি রক্ষিত এলাকায় ২ হাজার ৫শ হেক্টর বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং ১ হাজার ৩৩০ হেক্টর এলাকায় বন্যপ্রাণী চলাচলের পথের উন্নয়ন, ৬টি রক্ষিত বনে রক্ষিত বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন, পাখিশুমারি ও  রিং কার্যক্রম পরিচালনা করা, দেশের জাতীয় বনাঞ্চল ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা ও ৯৩টি ভবন নির্মান করা।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায় বেতন ও ভাতা খাতে পুকুর চুরির ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্প চলাকালীন সময়ে ১১৩জন ব্যাক্তি পরামর্শক নিয়োগ করে তাদের সম্মানী স্বরুপ ৫৯ কোটি ৬২ লাখ ৫৩ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এই সকল পরামর্শকদের মধ্যে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী সহ ২৩ জনের সম্পর্কে বাগান পরিদর্শনের তথ্য পাওয়া গেলেও ৯০ জন পরামর্শকের কার্যক্রমের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান এই কথিত ৯০ পরামর্শকের নামে প্রদত্ত সম্মানীর টাকা গোবিন্দ বাবু একটা পার্সেন্টেজ নিতেন। সরেজমিনে ঐসকল পরামর্শকদের ডেকে ভাউচারে উত্থাপিত স্বাক্ষর পর্যালোচনা করলে ভুয়া ভাউচারের বিষয়টি প্রমানিত হবে। যে ২৩ জনের সম্পর্কে বাগান পরিদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে অনেকেই বাগান কি জিনিস নিজ চোখে দেখেননি। শুধু মাত্র বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যলয়ে বসে চা নাস্তা খেয়েই পরিদর্শন কার্যক্রম শেষ করেছেন। একজন মধ্য বয়সী মহিলা পরামর্শক প্রকল্প কার্যক্রমে কোন অভিজ্ঞতা না থাকা স্বত্বেও শুধু মাত্র বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দপ্তরে ঘোরাফেরা করে সম্মানীর লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অথচ এই শ্রেণীর পরামর্শকদেরকেও মাসিক লক্ষাধিক টাকা পারিশ্রমিক দেয়া হয়েছে। সুত্রমতে বেশীরভাগ পরামর্শক প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠজন বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য পূর্ত কাজ সমূহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমেই করা হয়েছে। সেখানে দক্ষ প্রকৌশলীগন কাজ তদারকি করেছেন। সুফল প্রকল্পের মূখ্য উদ্ধেশ্য হচ্ছে বনায়ন কর্যক্রম। এই কার্যক্রম দেখভালের জন্য এত পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কোথায়। এটাও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের মতে বিশ্ব ব্যাংকের ঋন স্বরুপ প্রদত্ত এই বিপুল পরিমান টাকা সরকারকেই সুদসহ জনগনের ট্যাক্সের টাকায় পরিশোধ করতে হবে। অথচ এই ঋনের টাকা কয়েকজন বন কর্মকর্তা হাতিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় ছিলেন ব্যস্ত। দেশের কি হলো তা তাদের দেখার বিষয় নয়। নিজেদের আখের গোছানো নিয়ে তারা ব্যাস্ত।

KYOCERA ফটোকপি মেশিন

সুত্রমতে সরবরাহ ও সেবা খাতে কাগজ কলমে খরচ ঠিক রেখে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্ধেক টাকা আত্নসাতের ঘটনা ঘটেছে। সম্পদ সংগ্রহ ও ক্রয় সংক্রান্তে যে ব্যায় দেখানো হয়েছে তারও সিংহভাগ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য ১৫০ পিচ নিস্নমানের KYOCERA ফটোকপি মেশিন কেনা হয়েছে যার একেকটির মূল্য সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এই হারে ১৫০টি মেশিন ৬ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা দিয়ে কিনা হয়। বর্তমানে সবগুলি মেশিনই অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অনুরুপ এই খাতে ক্রয়কৃত অন্যান্য বেশীরভাগ সামগ্রী ব্যবহারে অনুপযোগি হয়ে পড়েছে।

এই প্রকল্পে বনায়ন কার্যক্রমেও মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘঠেছে। উপকূলিয় বনায়নে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার একর এলাকায় কোন বনই নেই। এনরিচম্যান্ট প্লান্টেশনে কোন কার্যক্রমই হয়নি। কোন বাগান না করেই পুরো টাকা আত্নসাতের ঘটনা ঘটেছে।

সমবায় ঋন এলডিএফ খাতেও মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যা সরেজমিন তদন্তে প্রমানিত হবে বলে সুত্র দাবী করে।

এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বরিশাল কোস্টাল সার্কেলের অধীনে গত ০৯-০৪-২০১৮ থেকে ১৪-১০-২০১৯ পর্যন্ত দেড় বছর বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন চরসহ উপকূলীয় এলাকায় বনয়ন প্রকল্পে পিডি দায়িত্ব পালনকালীন জিওবি অর্থায়নে ১০৮ কোটি ২১ লাখ টাকা বরাদ্দকৃত প্রকল্প থেকে ও প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘বন বিভাগে এহেন সিন্ডিকেট সংস্কৃতি দেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শুধু সরকারি অর্থ নয়, প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট করছেন।’ তাদের মতে, এই সিন্ডিকেটকে ভেঙে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ রক্ষার ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়বে। ( চলবে )

 

  • শেয়ার করুন