১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার,সকাল ৯:১৬

ডিপিডিসির” শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়া প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক শেখ এখনও কেন বহাল তবিয়তে ?

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

                                             প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক শেখ ডিপিডিসির

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হাসলীগাঁও গ্রামের সাদামাঠা মোঃ ফজলুল হক কৃষক এর সন্তান ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি)র” শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ও মাফিয়া প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক শেখ। স্থানীয় জনসাধারণের কাছে তিনি পরিচিত দানবীর হিসেবে( মহা-দানব )। গরিব-দুঃখীকে সহায়তার পাশাপাশি এলাকায় গড়েছেন সুদৃশ্য মসজিদ এবং মাদ্রাসা ও কলেজ, মাছের খামার ও নিজের বসবাসের জন্য বাড়ী । ঢাকা, শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়েছেন ৫০০ কোটি  কোটি টাকারও বেশি  অঢেল সম্পদ। কিন্তু ডিপিডিসির একজন প্রকৌশলী সরকারিভাবে যে বেতন পান, তাতে সাধারণ জীবন ধারণ করার কথা। তার শতকোটি টাকার মালিক হওয়ারও সুযোগ নেই।

অভিযোগ আছে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায়- নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে অর্থাৎ কেয়ার না করে ইচ্ছামতো অপক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ডিপিডিসিতে সরবরাহ, সাধারণ গ্রাহকদের সাব-স্টেশনের সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য করে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম এবং দুর্নীতি করে তিনি গড়েছেন ৫০০শত কোটি টাকার বেশি সম্পদ। বাধাহীনভাবে এসব অনিয়মকে চালু রাখতে ব্যবহার করেছেন ডিপিডিসিকে। তবে এত অনিয়ম করলেও তার বিরুদ্ধে এখনো নেওয়া হয়নি  তেমন কোনো ব্যবস্থা। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেও অদৃশ্য কারণে তাকে একপ্রকার দায়মুক্তি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের হাসলীগাঁও গ্রামে  সম্প্রতিকাল মাঠপর্যায় তদন্ত কালে এলাকাবাসীর কাছে ইঞ্জিনিয়ার রাজ্জাক শেখের ব্যপারে জানতে চাইলে তারা জানান রাজ্জাক ইঞ্জিনিয়ারের বাপ ফজলুর অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার শত শত কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়েছে । আমরা বললাম কি ভাবে হয়েছে ? জবাবে বললেন  তা আমরা বলতে পারবো না।  তবে কেহ জমি বিক্রি করতে গেলেই তার কাছে যায় । ইঞ্জিনিয়ার জমি বাড়ী পেলেই  ক্রয় করেন।  যার ফলে  অনেক সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।  কি চাকরি করেন তা কি জানেন – এমন প্রশ্ন করলে বলেন সে বড় চাকরি করেন, সে ইঞ্জিনিয়ার।  সে জমি রাখা ছাড়াও বিভিন্ন মানুষেরে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তার বাবা  ফজলুর হক শেখ কি করেন  জানতে চাইলে বলেন  আগে  খেতে খামারে কৃষি কাজ করতো এখন কিছু করে না। তবে তার বড় ভাই ইয়াকুব আলী শেখ চাউল ডাইলের দোকানদার।

ইঞ্জিনিয়ারের পুর্বের অবস্থা কেমন ছিল ? জনৈক ব্যক্তি বললেন অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান আব্দুর রাজ্জাক শেখ ।তারা ৫ ভাই তার বাবা একজন কৃষক, বড় ভাই ইয়াকুব আলী বাজারে মুদি দোকান্দার, বোন ছোট শিউলি শিক্ষকতা করেন। ঘুষ দুর্নীতি  করে সম্পত্তি পাহাড় করছে , গরীব অসহায় মানুষদের আসলে সাহায্য করেন কিন্তু অন্যকে ঠকাইয়া , মাইরা আইনা আমাগে দিলে কি  কাম অইবো।

অনুসন্ধানে আরও  জানা যায়, প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক শেখ ডিপিডিসির মগবাজার ডিভিশনে উপসহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে অনৈতিক অবৈধভাবে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময় দুই ধাপ টপকে সরাসরি সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি । সাভারের ভাকুর্তা এলাকায় প্রায় ৩০ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করেন ওশাকা পাওয়ার লিঃ নামের বিদ্যুতের সাব-স্টেশন নির্মাণ কারখানা। এ ছাড়া প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় চন্দ্রীমা মডেল টাউন প্রকল্পে ২টি বহুতল বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি ছাড়াও নিজ জেলা শেরপুরেও গড়ে তুলেছেন অঢেল বিত্তবৈভব সম্পদ। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হাসলীগাঁও গ্রামে প্রায় ৫ একর জমির ওপর বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি, বাড়ির সামনে নির্মাণ করেছেন দৃষ্টিনন্দন দোতলা মসজিদ আর পাশেই মাদ্রাসা। এর পাশেই করেছেন বিশাল মাছের খামার। একই এলাকার তিনআনি বাজারে বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি ও একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক তার বড় ভাইকে  ইয়াকুবকে দিয়ে পরিচালনা করছেন। তা ছাড়া শেরপুর শহরের নওহাটা এলাকায় ‘শেরপুর ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সিস্ট)’ এবং ‘সিসকো ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামের দুটি পলিটেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। শেরপুর পৌর এলাকার দীঘারপাড়ে ৬ একর জমিতে গড়ে তুলেছেন বিশাল মৎস্য খামার। তা ছাড়া শেরপুর বাসস্ট্যান্ডের জামুর দোকান ও রংমহল এলাকায় দুটি বাড়ি ছিল, যা তিনি এরই মধ্যে বিক্রি করে দিয়েছেন। এ ছাড়া গাজীপুরে তার আরও একটি বহুতল বিশিষ্ট বাড়ি রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট  সরকারের আমলে রাজ্জাকের কোম্পানি ওশাকা পাওয়ার লি. থেকে সাব-স্টেশন না কিনলে ডিপিডিসির আওতাধীন কোনো গ্রাহক উচ্চ চাপ সংযোগ পেতেন না। তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ দেওয়া হলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগ তদন্তে ডিপিডিসির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে গঠিত হয় কমিটি। সেই কমিটির সুপারিশে অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে নেওয়া হয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু প্রধান অভিযুক্ত প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি কর্তৃপক্ষ। উল্টো তদন্ত কমিটির প্রধানকেই পড়তে হয় ভোগান্তিতে। মাতুয়াইল, জুরাইন, শ্যামপুর ও কাজলা এলাকায় প্রকৌশলী রাজ্জাকের সিন্ডিকেট গ্রাহকদের তার সোলার প্যানেল নিতে বাধ্য করত।

জানা গেছে, প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় ডিপিডিসির বদলি, পদোন্নতিসহ ডিপিডিসির প্রায় সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। ঢাকাস্থ তার নিজ জেলা শেরপুর কিংবা ময়মনসিংহ বিভাগের কোনো অনুষ্ঠান হলেই ডিপিডিসির অনেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীদের থেকে বড় অঙ্কের টাকা চাঁদা নিতেন। তিনি এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন যে, তার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দফায় দফায় অভিযোগ করলেও তিনি সেগুলো ধামাচাপা দিয়ে রাখতেন। এসব অভিযোগের আর কোনো তদন্ত হয়নি। এতসব অনিয়মের পরও প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাককে বর্তমান সরকারের আমলেও ডিপিডিসির উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডিপিডিসির এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, প্রকৌশলী রাজ্জাক গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দোর্দণ্ডপ্রতাপের অধিকারী ছিলেন। তিনি ডিপিডিসিতে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই তাকে হেনস্তার শিকার হতে হতো। তার নেটওয়ার্ক এখনো এতটাই শক্তিশালী যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে গত ১৫ আগস্ট প্রকৌশলী রাজ্জাককে সিস্টেম কন্ট্রোল অ্যান্ড স্ক্যাডার দপ্তরে বদলি করা হলেও মাত্র ২৬ দিনের মধ্যে ১১ সেপ্টেম্বর তার বদলির আদেশ বাতিল হলে পূর্বের পছন্দনীয় প্রকল্প পরিচালক পদে বহাল থাকেন। পরে দীর্ঘদিনের বঞ্চিত প্রকৌশলীরা এ ব্যাপারে ক্ষোভ জানালে প্রকৌশলী রাজ্জাককে একই দিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে এক আদেশে ট্রেনিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের দপ্তরে বদলির আদেশ হয়।

জানা যায়, দ্বিতীয় স্ত্রীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানিয়ে রাজধানীর পান্থপথের ১৫২/২/এম (৩য় তলা) ঠিকানায় করপোরেট অফিস করে ওসাকা পাওয়ার লিমিটেডসহ অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন প্রকৌশলী রাজ্জাক। প্রকৌশলী রাজ্জাক ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘ওসাকা পাওয়ার লিমিটেড’-এর প্রস্তুতকৃত নিম্নমানের ট্রান্সফরমার বিভিন্ন প্রকল্পে সরবরাহ করেন। এভাবেই ২০১৬ সালের জুন মাসে একটি প্রকল্পে ওসাকা পাওয়ার লিমিটেডের নিম্নমানের ৩০০টি ট্রান্সফরমার সরবরাহ করার পর তা মানহীন হওয়ার অভিযোগে তৎকালীন প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বিল আটকে দেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে তদন্তে ৩শ ট্রান্সফরমারের মধ্যে ১৯১টিই মানহীন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রাজ্জাকের কুকীর্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) এ ও মন্ত্রনালয়ে একাধিকবার অভিযোগ জমা পড়লেও অসাধু কর্মকর্তাদের কারনে বার বারই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের যত অবৈধ সম্পদ অর্জন সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করে পাশাপাশি তার যে ক্ষমতার অপব্যবহার এসব অপরাধের কারণে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়ছে আমরা মনে করলেও মহাদুর্নীতিবাজ রাজ্জাকের ব্যপারে তেমন কিছু দেখতে পাওয়া যায়নি। আমরা মনে করি এ ধরনের অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত  না হলে যে ডিপিডিসির ভবিষ্যৎ হবে ভয়াবহ। কারন সরকার পরিবর্তন হলেই এইসব দুর্নীতিবাজরা আবার ঘুষ দুর্নীতি জালিয়াতি প্রতারনা গ্রাহকদের সাথে করবে। এতে ব্যবসায়িরা অপুরোনীয় ক্ষতির মুখে পরবে। বিষয়টি সঠিকভাবে ক্ষতিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনেকেরই দাবী রয়েছে।

প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের  হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালে তিনি বলেন  লেখেন  তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। দুর্নীতি দমন কমিশণ তদন্ত করতেছে,দেখি  কে কি করে !

  • শেয়ার করুন