১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার,রাত ৩:৩১

চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন।

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২৫

  • শেয়ার করুন

নিজস্ব সংবাদদাতা ঃ

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং বাণিজ্যের লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরকে দুর্নীতিমুক্ত করা, আধুনিকায়ন এবং সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘সচেতন নাগরিক ও ছাত্র জনতা’র ব্যানারে এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা তথ্য-উপাত্ত ও জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ (যার আর্থিক মূল্য ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার) এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অথচ দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে এটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ধীরগতির ও বায়বহুল বন্দরে পরিণত হয়েছে। বক্তারা দেশের স্বার্থে অবিলম্বে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত মূল দাবি যুক্তিসমূহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর তথ্যমতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ঘুষ বা ‘স্পিড মানি’ ছাড়া সময়মতো কোনো কাজ করা প্রায় অসম্ভব । এই অনিয়ম জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা) অতিরিক্ত খরচ চাপায়। বন্দরের এই বাড়তি খরচের ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়, যা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান বন্দরগুলোর মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রামেই কোনো আন্তর্জাতিক মানের বেসরকারি অপারেটর নেই, যা আমাদের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।

জাহাজ জট কমানো অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি:

বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে জাহাজ খালাস করতে যেখানে ৭ থেকে ১২ দিন সময় লাগে, সেখানে আধুনিক বেসরকারি অপারেটররা তা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করতে সক্ষম। তারা আধুনিক ক্রেন, অটোমেশন এবং ডিজিটাল ‘উইন্ডো বার্থিং সিস্টেম ব্যবহার করে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় বা ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।

উদাহরণ হিসেবে তানজানিয়ার ডিপি ওয়ার্ল্ডের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে আধুনিকায়নের ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় ৫ দিন থেকে কমে ২ দিনে নেমে এসেছে এবং কন্টেইনার গ্রুপট ১৮২% বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রামেও ২০০৭ সালের আংশিক সংস্কারে জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ১১ দিন থেকে ৪ দিনে নেমে এসেছিল, যা প্রমাণ করে সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি সম্ভব । জিরো ইনভেস্টমেন্টে বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন:

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোনো অর্থ ব্যয় না করেই বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব। বৈশ্বিক টার্মিনাল অপারেটররা সাধারণত ‘বিল্ড-অপারেট ট্রান্সফার’ (BOT) মডেলে কাজ করে, যেখানে তারা সরাসরি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে।

উদাহরণস্বরূপ, লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনালে ‘এপিএম টার্মিনালস’ (মার্ক গ্রুপ) আগামী ৩০ বছরের জন্য প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে বন্দরের গভীরতা বৃদ্ধি, উচ্চ-ক্ষমতার গ্যান্ট্রি ক্রেন স্থাপন এবং স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা সম্ভব হবে, যা সরকারের একার পক্ষে করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

 

সিন্ডিকেট দুর্নীতি নির্মূল

বর্তমানে বন্দরে জাহাজ জট, কাস্টমস ও পণ্য খালাস কেন্দ্রিক যে অনৈতিক লেনদেনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক অপারেটররা দায়িত্ব নিলে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। কারণ, আন্তর্জাতিক অপারেটরদের কঠোর অডিট ট্রেইল এবং “ASYCUDA” স্টাইল ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম মেনে চলতে হয়। অটোমেশন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের হস্তক্ষেপ কমবে এবং অবৈধ আয়ের পথ চিরতরে বাতিল হবে।

সার্বভৌমত্ব নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্দর ‘বিক্রি’ হয়ে যাচ্ছে বলে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বক্তারা স্পষ্ট করেন যে, সরকার এখানে ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল’ অনুসরণ করবে, অর্থাৎ সরকার ভূমির মালিক ও নিয়ন্ত্রক থাকবে।

বন্দরের কাস্টমস, ইমিগ্রেশন এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বরাবরের মতোই বাংলাদেশ সরকার এবং নৌবাহিনীর হাতে ন্যস্ত থাকবে। অপারেটররা কেবল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারিগরি সেবা প্রদানকারী বা লজিস্টিক পার্টনার হিসেবে কাজ করবে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণভোমরা এনসিটি (NCT) ও সিসিটি (CCT)- এর ব্যবস্থাপনায় বিদেশি অপারেটর যুক্ত হলে আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখতে অপরিহার্য।

কর্মসংস্থান শ্রমিক  সুরক্ষা:

বিদেশি অপারেটর আসলে চাকরি যাবে-এই ভীতি ছড়ানো হচ্ছে মূলত সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষার জন্য। বাস্তবে বিশ্বমানের অপারেটর আসলে বন্দরের কর্মক্ষমতা বাড়বে, ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হবে এবং তারা আন্তর্জাতিক মানের বেতন-ভাতা পাবেন। এছাড়া লজিস্টিক খরচ কমলে দেশের গার্মেন্টস ও রপ্তানি বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে বক্তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আবেগ দিয়ে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে বিচার করুন।” মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগী দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠীর অপপ্রচারে কান না দিয়ে, দেশের প্রবৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও বৈশ্বিক সংযোগ নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর অবস্থানে থেকে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি জাতীয় সম্পদ বিক্রি নয়, বরং জাতীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত কর।

  • শেয়ার করুন