প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬
মোঃ হুমায়ুন কবির :

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠতে অবশেষে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরিশ্রমী প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব প্রকৌশলী মো. শহীদুল হাসানকে চুক্তিভিত্তিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
জনমনে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে- এলজিআরডি মন্ত্রণালয় যেন “টাকা বানানোর মেশিন”। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতীতে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগও বহুবার উঠে এসেছে। কিন্তু নতুন সচিব মো. শহীদুল হাসান সেই চর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত এক ব্যক্তিত্ব।
তিনি দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাত বছর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়টিকে অনেকেই এলজিইডির “স্বর্ণযুগ” বলে উল্লেখ করেন। তার নেতৃত্বে গ্রাম, শহর ও পানিসম্পদ খাতে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়। একই সঙ্গে এলজিইডিকে আধুনিকায়ন ও গতিশীল করতে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেন। এর ফলে বিপুল বৈদেশিক তহবিল সংগ্রহ, নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন এবং এলজিইডির কার্যক্রমকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধিত হয়।
তিনি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেই মনোযোগ দেননি, বরং অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করে এলজিইডিকে একটি সেবাধর্মী ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বহুল আলোচিত ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে এলজিইডির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সে সময় দেশের বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্নীতি দমনের নামে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং অনেক কর্মকর্তা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। কিন্তু এলজিইডির ভেতরে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এলজিইডির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মুখে শোনা যায়- সে সময়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. শহীদুল হাসান দৃঢ় নেতৃত্ব ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করেছিলেন। এলজিইডিতে কোনো সেনা ক্যাম্প বসেনি, এমনকি কোনো কর্মকর্তাকে হয়রানির মুখেও পড়তে দেননি তিনি। কঠিন সেই সময়ে তিনি একাধিকবার তৎকালীন সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দক্ষতার সঙ্গে এলজিইডিকে সেনাবাহিনীর আস্থার জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন।
প্রকৌশলী মো. শহীদুল হাসান আশির দশকে তৎকালীন এলজিইবি (Local Government Engineering Bureau)-তে যোগদান করেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী এবং এলজিইডির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১০ ডিসেম্বর ২০০০ সালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৭ জুন ২০০৮ সালে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। এলজিইডির কিংবদন্তি প্রধান প্রকৌশলী মরহুম কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর পর অনেকেই মো. শহীদুল হাসানকে এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শক্তিশালী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন। তার অবসরের পর এলজিইডিতে তেমন গতিশীল ও প্রভাবশালী নেতৃত্ব আর দেখা যায়নি- এমন মন্তব্যও অনেকের মুখে শোনা যায়।
অবসরের প্রায় দুই দশক পর আবারও যখন এলজিআরডি খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত, তখন এই অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রশাসককে সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলেই মনে করছেন অনেকেই।
এদিকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে দক্ষ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সমন্বয়ে নতুন নেতৃত্ব গঠনের ফলে এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এক ধরনের নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে এলজিইডির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে উৎসাহ ও প্রত্যাশার সুর শোনা যাচ্ছে।
সবার প্রত্যাশা- সচিব হিসেবে মো. শহীদুল হাসানের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বে এলজিইডিতে আবারও একজন দক্ষ ও ডায়নামিক প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ পাবেন, এবং দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি আবারও তার হারানো গতি ফিরে পাবে।