প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিল করে মো. মোস্তাকুর রহমানকে একই পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। মোস্তাকুর রহমান ব্যয় ব্যবস্থাপনা বা কস্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে এফসিএমএ ডিগ্রিধারী। তিনি একজন ব্যবসায়ী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো।
মোস্তাকুর রহমান হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর। গতকাল বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ অনুযায়ী মোস্তাকুর রহমানকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ প্রদান করা হলো। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এর আগে আরেকটি প্রজ্ঞাপনে গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। ২০২৮ সালে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর চুক্তির মেয়াদ ছিল। নতুন গভর্নর নিয়োগের আগে কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিলেন।
চুক্তি বাতিলের আগে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আহসান মনসুর বলেন, ‘পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।’ এদিকে সংবাদ সম্মেলনের পরই নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই আহসান এইচ মনসুর বাসায় চলে যান।
নতুন গভর্নরের পরিচিতি
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের জীবনবৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালে ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত বিএনপির ৪১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ২৩তম সদস্য ছিলেন।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। হেরা সোয়েটার্স নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে হেরা সোয়েটার্সের ৮৬ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণটি খেলাপি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ সুবিধার আওতায় গত বছরের জুনে তা পুনঃ তফসিল করা হয়।
রপ্তানিমুখী পোশাক ছাড়াও মোস্তাকুর রহমানের আবাসন খাতে ব্যবসা রয়েছে বলে জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও জানানো হয়, তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আর্থিক খাত নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষ করে করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।
মোস্তাকুর রহমান বিজিএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) এবং ঢাকা চেম্বারের সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসছে। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পরিবর্তন তো শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকে হয়নি, পরিবর্তন অনেক জায়গায় হচ্ছে। এবং এটা তো হতেই থাকবে। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের যে প্রোগ্রাম আছে, প্রেফারেন্স আছে, চিন্তা আছে, ভাবনা আছে, সবকিছুর সাথে মিলিয়ে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন সেখানে তো পরিবর্তন হবেই।’
আহসান মনসুরের বিদায়
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ কমতে থাকে, ডলারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে এবং ব্যাংকে বাড়ে খেলাপি ঋণ। পাশাপাশি সরকারও বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দেয়। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে পড়ে।
ব্যাংকে লুটপাট, ঋণের নামে টাকা সরিয়ে নেওয়া, অর্থ পাচার, জোর করে ব্যাংকের মালিকানা হস্তান্তর ইত্যাদি নানা ঘটনা ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই বছরের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করার সময় বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আহসান এইচ মনসুরের। তিনি সর্বশেষ ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করার পরও তা নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হন। পাশাপাশি ডলার বিক্রি বন্ধ করার পরও রিজার্ভ বাড়াতে পেরেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন (২ হাজার ৫৯২ কোটি) ডলার। যদিও আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি (বিপিএম-৬) অনুযায়ী, তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন (২ হাজার ৪৮ কোটি) ডলার। গত মঙ্গলবার দিন শেষে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫০৪ কোটি) ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ রয়েছে ৩০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন (৩ হাজার ৩০ কোটি) ডলার।
সাধারণত তিন মাসের আমদানির সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থাকলে তা স্বস্তিদায়ক হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের এখন আছে ৫ থেকে ৬ মাসের আমদানির সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত।
সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯ আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি সরকার। দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা বাড়ানো, তদারকি নিবিড় ও শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং বিভাগ বিলুপ্তির কথা বলেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপির ইশতেহার পূরণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নতুন গভর্নরের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী নিঃসন্দেহে নতুন গভর্নরের সামনে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ। তিনি ব্যবসায়ী। গভর্নর পদে তাঁর সামনে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি আসবে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেখানে তিনি নির্মোহ থেকে কতটা শক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটা দেখার বিষয়। তিনি আরও বলেন, আহসান এইচ মনসুর একটি সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, যা সমাপ্ত হয়নি। নতুন গভর্নরকে খেলাপি ঋণ আদায়ে শক্ত হতে হবে। সেটা হবে তাঁর ‘অ্যাসিড টেস্ট’।
মুস্তফা কে মুজেরী আরও বলেন, বিএনপি দেশকে পরিবর্তনের কথা বলছে। তার পূর্বশর্ত আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা। সেটা না থাকলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না।