১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার,রাত ৩:২১

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে বিদ্যুতের আগ্রাসন

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৫

  • শেয়ার করুন

লোহাগাড়া প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের এলাকায় পাহাড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। একসময় বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই অভয়ারণ্যে এখন বিদ্যুতের দখলদারিত্ব। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের আঘাতে বনের প্রাণী ও প্রকৃতি আজ প্রায় বিপন্ন।

দীর্ঘদিন ধরে বন, পাহাড় ও ঝরনাধারার মনোরম সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অভয়ারণ্য এখন যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর জন্য। কোথাও গাছ কেটে, কোথাও পাহাড়ের বুকে খুঁটি বসিয়ে টানা হয়েছে বিদ্যুৎ লাইন। ফলে অভয়ারণ্যের প্রাণীজগৎ, প্রকৃতি ও বাস্তুসংস্থান মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, বাঁশখালী, সাতকানিয়া ও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই বন। বনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র রক্ষা ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য ১৯৮৬ সালে এটি অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এশীয় বন্যহাতির যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, নির্বিচারে গাছ কাটা, কৃষিজমিতে রূপান্তর ও অনিয়ন্ত্রিত মানবচাপের কারণে বনের অস্তিত্ব আজ সংকটে। তার ওপর নতুন করে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের ‘আগ্রাসন’।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভয়ারণ্যের ভেতর গাছ কেটে ও পাহাড় কেটে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বসানো হয়েছে। এতে শুধু বন নয়, এখানকার জীববৈচিত্রও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। ঝুলে থাকা হাই ভোল্টেজ তারে দুর্ঘটনায় মারা পড়ছে বন্যপ্রাণী। বনের নীরবতা ভেঙে গর্জে উঠছে যন্ত্রের শব্দ।

অভয়ারণ্যের লুতু মিয়ার ঘোনা এলাকায় দেখা যায়, বনের গভীর ভেতর দিয়ে টানা হয়েছে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন। এই লাইনের জন্য স্থাপন করা হয়েছে একাধিক বৈদ্যুতি খুঁটি। কোথাও কোথাও গাছ কেটে ফাঁকা করা হয়েছে লাইনের পথ। ফলে প্রাণীদের চলাচলের রাস্তাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, চুনতি অভয়ারণ্যে বিদ্যুতের নামে যে অদৃশ্য আগ্রাসন চলছে, তা এখনই না থামালে হারিয়ে যাবে বহু প্রজাতি, নষ্ট হবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য একটি সংবেদনশীল ও আইনগতভাবে সংরক্ষিত এলাকা। সেখানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতিমালার পরিপন্থী। এটি শুধু গাছপালা নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। বনের ভারসাম্য রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তারা অবিলম্বে বৈদ্যুতিক খুঁটিসহ সঞ্চালন লাইন উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন।

বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা বলেন, অভয়ারণ্যের ভেতর যখন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছিল, তখনই বাধা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাধা অমান্য করে কাজ সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩ জুন লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম বরাবরে চিঠি পাঠানো হয়েছে বিদ্যুৎ লাইন অপসারণের অনুরোধ জানিয়ে।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষণা শতভাগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়েছিল। সে সময় অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষ কোনো বাধা দেয়নি। তারা যদি অপসারণের উদ্যোগ নেয়, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করবে।

  • শেয়ার করুন