প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৫
প্রকাশিত:

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ
আশিয়ান গ্রুপেরএমডি নজরুল ইসলাম মাছ বিক্রেতা থেকে হয়ে ওঠেন জমি বিক্রেতার দালাল। এখান থেকে তার উত্থান হয়। প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে জমি ক্রয়ের চেয়ে দ্বিগুন টাকা নিত।এ ঘটনা ঐ কোম্পানি জানতে পারে নজরুলের কাছ থেকে জমি কেনা বন্ধ করে দেয়। এরপরই সরকারী জমি অন্যের জমি দখল করে চটকদার লোভনীয় বিজ্ঞাপন, নাকে শরিসার তেল দিয়ে ঘুমান” এভাবে নানান ছলছতুরি করে সরল মানুষদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।আর সে হয়ে ওঠেন আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্টন্স লিমিটেডের মালিক। বিরুদ্ধে জমি দখল, প্লট জালিয়াতিসহ অসংখ্য অভিযোগ পাহাড় ছুঁয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার নামও জড়িয়ে আছে বহু অপকর্মের সঙ্গে। যে ঠিক করে নামটাও লেখতে পারে না সে হন একটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।আবার পরেন কম্পিলিট স্যুট গলায় পরেন টাই।হায়রে আমার বাংলাদেশ।এর আগেও অনেক মামলা হয়েছে তার কিছু হয় নাই । কারন তার সাথে রয়েছে পুলিশ প্রশাসনের লোকজন। যার ফলে দিব্বি ঘুরে বেড়ায়।গত বছরের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় তার নামে ২৩ টি হত্যা মামলাই হয়েছে। এছাড়া গুম, চাঁদাবাজিসহ বহু কুকর্মে তার জড়িত থাকার কথা শোনা যায়। এসবের বাইরে তিনি হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে।
দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণগ্রহীতাদের ঋণ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিভাগের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে আসিয়ানের এমডি নজরুলের ৯৮২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে আশিয়ান এডুকেশনের নামে আছে ৬৪৬ কোটি টাকা। এ বিষয়ে নজরুল বলেন সব মিথ্যা কথা । কারন ব্যাংকের অনেক অফিসারই তার লোনের সাথে জড়িত। নজরুলের নিজস্ব বাবারও তেমন কোন জমি নেই । কোন কাগজ পত্রের উপর বিত্তি করে নজরুলকে ব্যাংক কোটি কোটি টাকা লোন দিয়েছে তা তদন্ত করা দরকার।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সম্প্রতি নজরুলের প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা জারি করে বলে জানা যায়। এতে এই ভুমিদস্যু নজরুল কিছুই মনে করেন না। তার জমি দখল, প্রতারণা, জালিয়াতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যহত।
আশিয়ান সিটির সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্যাতন, দখল, চাঁদাবাজি, বসতবাড়ি ভাঙচুর, জাল দলিল, জোড় করে গেট নির্মাণ, রাস্তা তৈরিসহ বহু অভিযোগ আছে। এ জন্য তাকে ভূমিখেকো উপাধি দিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা নজরুলকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারেরও দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ আছে, আশিয়ান গ্রুপের নামে ব্যাংক ঋণ নিয়ে ও আশিয়ান সিটির গ্রাহকদের টাকা ব্যবহার করে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন ভূমিখেকোখ্যাত নজরুল। জমি দখল করে প্লট বিক্রির নামে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে টাকা নিলেও তারা প্রতিশ্রুত প্লট বা ফ্ল্যাট পাননি। ফেরত দেওয়া হয়নি টাকাও। আবার তারা নজরুলের সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে কারো কাছে অভিযোগও দিতে পারছেন না।
আশিয়ানের ঋণের বিষয়ে জানতে চাইলে এবি ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মিজানুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ‘গ্রুপের সব ঋণের অবস্থাই খারাপ। পুরো ঋণই এখন খেলাপি। আমরা যোগাযোগ করেও তার সাড়া পাচ্ছি না।’
আশিয়ান গ্রুপের ঋণের জাল
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশিয়ান গ্রুপ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে ছয়টি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আশিয়ান গ্রুপের কাছে এখনো খেলাপি ঋণ হিসেবে এবি ব্যাংকের ৪০৪ কোটি ৬১ লাখ, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৯০ কোটি ৯০ লাখ, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ২৩ কোটি ২৬ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১০০ কোটি, ইসলামী ব্যাংকের ৩৪৩ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ১৫ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকের ৫ কোটি ৫০ লাখসহ ৯৮২ কোটি টাকা আছে। এর মধ্যে আশিয়ান এডুকেশনের নামে খেলাপি ৬৪৬ কোটি টাকা।
প্লট বিক্রিতে রাজউকের নিষেধাজ্ঞা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত আশিয়ান ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের আশিয়ান সিটি প্রকল্পের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, বিক্রয় ও প্রচার কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে রাজউক। চলতি বছরের গত ৮ আগস্ট সংস্থাটির নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন শাখার উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ-১ মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত নোটিসে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাজউকের নোটিসে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার দক্ষিণখান মৌজায় গড়ে ওঠা আশিয়ান সিটি প্রকল্প এখনো অনুমোদন পায়নি।
এক আদেশে সুপ্রিম কোর্ট ৩৩ একর জমিতে আবাসিক উন্নয়নের অনুমতি দিলেও প্রতিষ্ঠানটি সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও অনলাইনের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্লট বিক্রি করছে, যা আইনত অবৈধ।
২০০৪ সালের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা (সংশোধিত ২০১১ ও ২০১৫) এবং ২০১০ সালের রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া কোনো জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা বিজ্ঞাপন প্রচার করলে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
রাজউক জানায়, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা না দিলে প্রকল্পের সব বিজ্ঞাপন, বিক্রয় কার্যক্রম ও সাইনবোর্ড জোরপূর্বক সরিয়ে ফেলা হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে আশিয়ান সিটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে প্রতিষ্ঠানটি আবার জমি দখল ও বিক্রির চেষ্টা শুরু করে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে রাজউক।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, আশিয়ান সিটির যে পরিমাণ জমি প্রকল্পে আছে, তার চেয়ে মানুষের কাছে বিক্রি করেছে ১০ গুন বেশি। নিজস্ব জমি যেটুকু দাবি করা হচ্ছে তার বড় অংশই দখল করা। আশিয়ান সিটির জন্য আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের কেনা জমি পাওয়া গেছে ৩১৮০ কাঠার (১৫৯ বিঘা) মতো যাহা সাধারন মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা আয় করা টাকায়। কিন্তু প্লট বিক্রি করা হয়েছে ৩২ হাজার কাঠারও বেশি। প্লট বিক্রি করে আশিয়ান সিটি দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করেছে।
সংস্থাটি আরো জানায়, ২০০৫ সালে প্রকল্পের জন্য রাজউক ও ঢাকা জেলা প্রশাসন থেকে ৪৩ একর জমির অনুমোদন নেয় আশিয়ান সিটি। পরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমির পরিমাণ ১ হাজার ১৯৭ একর করে রাজউক ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নেওয়া হয়। বাস্তবে এই পরিমাণ জমি কখনোই প্রকল্পে ছিল না। আশিয়ান সিটি ক্রেতাদের কাছে বহু বায়বীয় প্লট বিক্রি করেছে।
‘বেআইনি’ এই প্রকল্প অবৈধ ঘোষণা করেছে উচ্চ আদালতও। ২০১২ সালে আটটি পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠনের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আশিয়ান সিটি প্রকল্পকে অবৈধ বলে রায় দেয়। পরে হাইকোর্টেরই আরেকটি রিভিউ বেঞ্চ প্রকল্পটিকে বৈধ ঘোষণা করলে রিট আবেদনকারীরা আপিল বিভাগে যায়।
আপিল বিভাগ ২০১৭ সালের আগস্টে হাইকোর্টের রিভিউ বেঞ্চের রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়ে আশিয়ান সিটির সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে। (চলবে)