প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬
প্রকাশিত:
বিশেষ প্রতিবেদক: ঢাকার শ্যামপুর সাব–রেজিস্ট্রি অফিসে যেন ‘ইমরান নীতিতেই‘ চলছে সব কার্যক্রম। কেবল নামের উমেদার বা দৈনিকভিত্তিক অনিয়মিত কর্মচারী হলেও, পুরো শ্যামপুর সাব–রেজিস্ট্রি অফিস জিম্মি হয়ে পড়েছে উমেদার ইমরান ও তার গড়ে তোলা চক্রের কাছে। ৬০ টাকা বেতনের অনিয়মিত কর্মচারী হয়েও বিলাসবহুল জীবনযাপন, গাড়ি–বাড়ি, ফ্ল্যাট, একাধিক দোকান ও অঢেল জমির মালিক বনে যাওয়া এই ইমরানের ক্ষমতার উৎস নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।লাখ টাকার জীবনযাপন ও অঢেল সম্পত্তির মালিক।
শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে কর্মরত এই উমেদার প্রকাশ্যে রাজকীয় ও আলিশান জীবনযাপন করেন। ব্যক্তিগত প্রাইভেট কারে যাতায়াত, পরিবার নিয়ে প্রতি বছর প্লেনে করে ভারতে ভ্রমণ, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, দোকান ও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেজগাঁও কলোনি বাজার শিল্পাঞ্চল থানার পেছনে ইমরানের নিজের নামে দুটি দোকান রয়েছে। কদমতলী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেরাজনগর বি-ব্লক প্রধান সড়কের পাশে ২৫২/৩ নম্বর হোল্ডিং সংলগ্ন ১০ তলা ভবনে রয়েছে জায়গা সহ ফ্ল্যাট (যার নথি মোতাবেক মাতুয়াইল মৌজা, আরএস-২৫, সিটি জরিপ-২০ নং খতিয়ান, সিএস-৩৩২ ও এসএ-১৫৪)। এছাড়া ইমরানের পিতা ইয়ার আলীর নামে গাজীপুর ও টঙ্গীতে বিপুল পরিমাণ জমি, একাধিক প্লট ও বাড়ি রয়েছে।
এক অনিয়মিত কর্মচারীর মাসে মাত্র কয়েক টাকা বেতনে কীভাবে এমন বিপুল সম্পত্তি অর্জিত হলো—তা নিয়ে সাধারণ দলিল লেখক ও সেবাগ্রহীতাদের মাঝে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
নিজস্ব সহকারী ও বাবুর্চি: মাসে দেড় লাখ টাকা খরচ
শুধু নিজের সম্পদই নয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একক আধিপত্য বজায় রাখতে ইমরান ক্যাডার ও সহকারী বাহিনী পুষছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার নিজস্ব দুই সহকারী এবং অফিসে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য আলাদা লোক নিয়োজিত রাখা হয়েছে। কেবল তাদের বেতন ও প্রাত্যহিক বাজার খরচের জন্য প্রতি মাসে ইমরানের পকেট থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
’সাব-রেজিস্ট্রারের অন্যতম বিশ্বস্ত’
অফিসের কর্মচারী ও দলিল লেখকদের মতে, শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ইমরানের কথাই শেষ কথা। অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুর মতো সম্পর্ক। দলিল লেখকরা জানান, কোনো কাজের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে গেলে তিনি সরাসরি উমেদার ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। ইমরানের অনুমতি ছাড়া বা তার স্বাক্ষর ব্যতিরেকে কোনো দলিলই রেজিষ্টি করা হয় না।
এমনকি সাব-রেজিস্ট্রারের যাবতীয় অনৈতিক লেনদেন ও ঘুষের টাকা লেনদেনের নিরাপদ মাধ্যম এই ইমরান। সাব-রেজিস্ট্রারের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত এবং একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রভাব খাটিয়ে পুরো অফিস নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তিনি।
রাজনীতি ও ক্ষমতার দাপটে তটস্থ সবাই
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের সময়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের সুপারিশে এই অফিসে নিয়োগ পেয়েছিলেন ইমরান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে বছরের পর বছর এলাকায় ও অফিসে নানা অপকর্ম চালিয়ে গেছেন তিনি। বিরোধে জড়িয়ে একাধিকবার মারামারিতে লিপ্ত হলেও তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি।
ইমরানের বিরুদ্ধে অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা দলিল লেখক কথা বললেই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় কিংবা নানাভাবে হয়রানি সহ্য করতে হয়। ফলে দীর্ঘ এক দশক ধরে এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সবাইকে তটস্থ রেখে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রেখেছেন তিনি।
অনিয়ম ও দুর্নীতির চাদরে ঢাকা শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে এবং উমেদার ইমরান ও তার চক্রের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় দলিল লেখকরা।