প্রকাশিত: আগস্ট ২১, ২০২৬
প্রকাশিত:
বিশেষ প্রতিনিধি ঃ পুলিশ টেলিকম সংস্থায় কর্মরত পরিদর্শক ( আরওআই) মোঃ রেজাউল করিম এবং তাঁর সহযোগী বেতার কনস্টেবল সোহাগের বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে বহাল তবিয়তে থাকা বিতর্কিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, পুলিশ টেলিকমের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে পরিদর্শক রেজাউল একটি শক্তিশালী বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ওসি (এমটি) পদে থাকাকালে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের ইচ্ছামতো বদলি করে জনপ্রতি ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা এবং জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ থেকে বদলির ক্ষেত্রে ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুস আদায় করতেন তিনি। পরবর্তীতে তদবির ও কৌশলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ‘আরওআই’ (ROI) পদটিও হাতিয়ে নেন।
অনুসন্ধান ও অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে, বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের নাম ভাঙিয়ে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করতেন রেজাউল। সেসময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অমান্য করায় তাকে বিভাগীয় শাস্তির মুখেও পড়তে হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাতারাতি নিজের অবস্থান বদলে বিএনপি পন্থী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করেন। যদিও ৫ আগস্টের পর ডিএমপির শিরু মিয়া অডিটোরিয়ামে এক সভায় পুলিশের সাধারণ সমন্বয়কারীরা তাকে চিনতে পেরে ধাওয়া দিয়ে বের করে দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চরিত্রহীনতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে পরিদর্শক রেজাউলের বিরুদ্ধে। বর্তমানে স্ত্রী না থাকা সত্ত্বেও রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টার নিজের নামে বরাদ্দ রেখে সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, এমটি শাখায় কর্মরত বেতার কনস্টেবল সোহাগ সরাসরি রেজাউলকে নারী সরবরাহ করার কাজে যুক্ত। গত ১২ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ৫,০০০ টাকার বিনিময়ে এক নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে কোয়ার্টারে নিয়ে যান রেজাউল। পরদিন সকালে ডিএমপির ১ নম্বর গেটে ওই নারী আটক হলে কনস্টেবল সোহাগ ও স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সহায়তায় অনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এর আগে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও সরকারি বাসভবন অবৈধভাবে সাবলেট দিয়ে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন।
এমন সব গুরুতর ও প্রমাণিত অভিযোগের পর ২০ আগস্ট ২০২৬ এডিশনাল আইজিপি (টেলিকম) মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পরিদর্শক রেজাউল করিমকে কেবল ট্রেনিং শাখায় বদলি করা হয়েছে।
এই বদলির আদেশে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যরা। সাধারণ সদস্য ও পুলিশের অভিজ্ঞ মহল প্রশ্ন তুলেছেন—বদলি কি কোনো আইনি শাস্তি হতে পারে? একজন কর্মকর্তা যখন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে থেকে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি বাসভবনে অনৈতিক কাজ এবং নারী সরবরাহের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হন, তখন তাকে কেবল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি করা অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ারই শামিল। এতে অপরাধীদের মনে ভীতি তৈরি হওয়ার বদলে বরং উৎসাহ যোগায়।
ক্ষতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের দাবি, এই বিতর্কিত পরিদর্শক ও তাঁর সহযোগী কনস্টেবল সোহাগের খুটির জোর বা শক্তির উৎস কোথায় তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। কেবল বদলি দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা না দিয়ে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পরিদর্শক রেজাউল করিমের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, উক্ত অভিযোগের অনুলিপি অবগতির জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন), অতিরিক্ত আইজিপি (টেলিকম) এবং ডিআইজি (অ্যাডমিন)-সহ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিকট পাঠানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নেন নাকি এই ‘বদলি নাটকেই’ থেমে থাকে বিচার পক্রিয়া?