১৩ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার,রাত ১২:১৭

শিরোনাম
মেয়াদ শেষের ১১ মাস আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের নিয়োগ বাতিল রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান আমানতের উৎসে কর সরকারি কোষাগারে জমার সময় বেঁধে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়ের পেট্রলপাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাই প্রধানমন্ত্রী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যাচ্ছেন আজ পুলিশের হাত থেকে যুবলীগ নেতাকে ছিনিয়ে নিলেন যুবলীগ কর্মীরা শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে: মন্ত্রী চিকিৎসক সমাবেশের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী জুলাইয়ের গণআন্দোলন: আঠারো কোটি মানুষের আরেকটি স্বাধীনতার স্বপ্ন

নিউমার্কেটে সংঘর্ষ: ছাত্রদল-যুবদলের ১০ নেতা বহিষ্কার

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক ঃ     রাজধানীর নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকার ফুটপাতে প্রায় পাঁচ হাজার দোকান রয়েছে। এসব এলাকায় আধিপত্য যার থাকে, ফুটপাতের কোটি টাকার চাঁদা তার। গত কয়েক যুগ ধরে এভাবেই চাঁদাবাজি চলে আসছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দোকানপ্রতি দৈনিক চাঁদা, ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং নতুন করে বসার জন্য এককালীন অগ্রিমের নামে চলে বিপুল অর্থ লেনদেন। এই নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, কে কত টাকা তুলবে আর সেই টাকা কারা ভাগ করে নেবে—তা নিয়েই একাধিক পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রদল ও নিউমার্কেট থানা যুবদলের সংঘর্ষের নেপথ্যে ছিল এই আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

এদিকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে উভয় পক্ষের ১০ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই মামলা করেনি।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, কোনো পক্ষই থানায় মামলা করেনি। মামলা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা জানতে পেরেছি তারা নিজেরা বসে সমস্যার সমাধান করবে।

নিউমার্কেট এলাকার চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এগুলো চলে আসছে। এখানে পুলিশের তেমন কিছু করার নেই। চাঁদাবাজদের বাধা দিলে পুলিশই এখানে থাকতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, ফুটপাতে দোকান বসানো বন্ধ করা গেলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। এক্ষেত্রে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ চাঁদাবাজি সব সময় সরকারি দলের সমর্থকেরা করে থাকে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, সায়েন্স ল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, গাউছিয়া, নীলক্ষেত মোড়, নিউমার্কেটের ১ থেকে ৪ নম্বর গেট, নিউমার্কেটের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশ, কাঁচাবাজার, ঢাকা কলেজ পেট্রোল পাম্প এলাকা, বাবুপুরাসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত ‘ভাড়া’ তোলা হয়। এর বাইরে বিদ্যুৎ বিল হিসেবে ৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

দোকানিদের অভিযোগ, বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীককে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসব টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতিটি দোকানদারকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হয়। বিভিন্ন দলের ‘লাইনম্যান’রা দুপুর ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চাঁদা তোলেন। বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও চাঁদাবাজি চলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে দোকানে বসাতে ব্যবসায়ীরা ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন স্থানীয় নেতাদের।

নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রায় পাঁচ হাজার দোকান থেকে চার-পাঁচটি ভাগে প্রতিদিন ২৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা আদায় করা হয়। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এখানে থাকতে হলে চাঁদা দিতেই হবে।

বহু বছর ধরে ব্যবসা করছেন এমন কয়েকজন জানান, চাঁদা দেওয়া ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। দোকানপ্রতি বিদ্যুৎ বিলের নামে ২০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হয়। তাদের দাবি, অন্তত দুটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। একটি সিন্ডিকেটকে দোকানপ্রতি প্রতিদিন ২০০ টাকা এবং ভালো অবস্থানের দোকানের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা দিতে হয়। এর বাইরে দোকান ‘ভাড়া’ হিসেবে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। দোকান ও জায়গা নিয়ন্ত্রণ এবং টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ থেকেই কয়েক দিন পরপর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলেও ব্যবসায়ীরা জানান।

নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (অপারেশন) খাইরুল বাশার জানান, চাঁদাবাজির বিষয়টি তারাও শুনেছেন। জনশ্রুতি রয়েছে, কয়েকটি গ্রুপ সেখান থেকে চাঁদা তোলে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দোকানদার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করেননি। তাই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবারের সংঘর্ষের বিষয়ে সূত্র বলছে, বলাকা সিনেমা হলের সামনে ঢাকা কলেজের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতা এবং নিউমার্কেট থানা যুবদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ সেই অদৃশ্য অর্থের লড়াইকে ফের প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। বাকবিতণ্ডা থেকে হাতাহাতি, এরপর হামলা-পালটা হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যদের পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের অভিযোগ, নিউমার্কেট থানা যুবদলের সদস্যসচিব কে. এম. চঞ্চলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত মো. সোহেল ও আজিম ওরফে ‘গুণ্ডা আজিম’ বলাকা সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতের দোকান ও ভ্যানগাড়ি থেকে জোরপূর্বক চাঁদা তুলতে যান। সেখান থেকে ঝামেলার সূত্রপাত।

অন্যদিকে ছাত্রদলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে নিউমার্কেট থানা যুবদল। তাদের দাবি, তারা কোনো চাঁদাবাজি বা দোকান দখলের সঙ্গে জড়িত নয়। বরং মঙ্গলবার বিকেলে মার্কেট বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন সদস্য নিউমার্কেটের কিছু দোকান দখল এবং দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করছিলেন।

স্বেচ্ছাচারিতা, পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের অন্তর্গত নিউমার্কেট ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের পাঁচ নেতাকে দলীয় দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বুধবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন—ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আওতাধীন নিউমার্কেট থানার সদস্যসচিব কে এম চঞ্চল, যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুব, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্যসচিব শাহাদাত এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার ও সুমন (চায়না সুমন)। তাদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এছাড়া ঢাকা কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রদলের ৫ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এক বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদল জানায়, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ঢাকা কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুলহাস আহমেদকে প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

একই সঙ্গে সংগঠনের চার নেতা—যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন শিকদার, প্রিন্স খন্দকার, সদস্য সাগর খান এবং মির্জা গোলাম রায়হানকে স্ব স্ব সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অন্য এক বিজ্ঞপ্তিতে নিউমার্কেট থানা যুবদলের আহ্বায়ক মিজান ব্যাপারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

 

  • শেয়ার করুন