প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ

ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল পরিষ্কার রাখতে পর্যটকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান শহীদ আফ্রিদির
একসময় মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নানা মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা ছিল। সেই বাস্তবতায় ২০১৯ সালে কুয়ালালামপুর সম্মেলন থেকে পাকিস্তানের সরে দাঁড়ানোর ঘটনাও দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও তুরস্কের বিপরীতমুখী অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সাত বছর পর সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে।
শুক্রবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেছেন। এর মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হয়েছে। চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা এবং সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এই চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত পাকিস্তান-সৌদি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, এক সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি গ্রহণ করা হয়।
মাত্র কয়েক বছর আগেও যে দেশগুলো মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতায় ছিল, তারাই এখন নিরাপত্তার প্রশ্নে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে। আদর্শগত পার্থক্য ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তিন দেশকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সম্মিলিতভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ত্রিপক্ষীয় এই চুক্তি হঠাৎ করে হয়নি। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছিল। গত বছর ইসলামাবাদ ও রিয়াদের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হওয়ার পর তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।
প্রথমদিকে তুরস্কের নীতিনির্ধারকেরা কিছুটা সতর্ক ছিলেন। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সামরিক জোট হিসেবে এই উদ্যোগকে যেন দেখা না হয়, সেটিই ছিল আঙ্কারার অন্যতম উদ্বেগ। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন পরিস্থিতি বদলে দেয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে একের পর এক হুমকি, মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তিন দেশের কাছেই ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
তিন দেশের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক। কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে এটি পরিচালিত হবে না। এর মূল লক্ষ্য প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
প্রচলিত সামরিক জোটের মতো কোনো নির্দিষ্ট শত্রুকে মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এই চুক্তি করা হয়নি। বরং মক্কা চুক্তিকে এমন একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সম্ভাব্য আগ্রাসন নিরুৎসাহিত করা এবং একই সঙ্গে তিন দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা হবে।
তিন দেশই এই জোটে আলাদা ধরনের কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে আসছে।
পাকিস্তানের রয়েছে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, দীর্ঘ সামরিক অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা। তুরস্কের রয়েছে দ্রুত বিকাশমান নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প। যুদ্ধ ড্রোন, নৌযান, উন্নত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে দেশটি উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব দিচ্ছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
ফলে তিন দেশের সম্মিলিত সক্ষমতা তাদের পৃথক শক্তির চেয়েও অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে তার দীর্ঘদিনের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সৌদি আরবের জন্য এটি এমন সময়ে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করছে, যখন উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আর তুরস্কের জন্য চুক্তিটি দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।
সামরিক সহযোগিতার বাইরে তিন দেশের মধ্যে যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সমন্বিত সামরিক মহড়া, সাইবার নিরাপত্তা এবং সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে এর ভবিষ্যৎ বিস্তার।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নতুন নিরাপত্তা কাঠামোটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অন্য দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য সদস্যদের নাম প্রকাশ না করা হলেও কয়েকটি মুসলিম দেশ এই কাঠামোর অধীনে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ কারণে মক্কা চুক্তি শুধু তিন দেশের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। এটি ধীরে ধীরে আরও দেশকে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আগের বিভিন্ন মুসলিম সামরিক সহযোগিতা উদ্যোগের তুলনায় এই কাঠামোর বিশেষত্ব হলো, এটি আদর্শগত ঐক্যের পরিবর্তে বাস্তব প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় এবং যৌথ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। রাজনৈতিক ঘোষণাকে কার্যকর সামরিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে হলে সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্পের যৌথ প্রকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সমন্বয়ের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক সম্পদ প্রয়োজন হবে।
তারপরও শুক্রবারের এই স্বাক্ষর শুধু আরেকটি প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘটনা নয়। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যে বিভাজন একসময় পাকিস্তানকে বন্ধুদের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বাধ্য করেছিল, এখন সেই বিভাজনের জায়গায় এসেছে তিন প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি তাই ভবিষ্যতে শুধু পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হিসেবে পরিচিত নাও হতে পারে। এটি আরও বিস্তৃত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে উঠতে পারে। বর্তমান কূটনৈতিক গতি অব্যাহত থাকলে এই চুক্তিকে একটি প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সূচনা হিসেবে দেখা হতে পারে।