প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে থেকেই দেশের বেসরকারি খাতে যে মন্দা অবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এখনো কাটেনি। বন্ধ হয়ে পড়া শিল্পকারখানাগুলো চালুর জোরালো উদ্যোগ নেই, নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ কম। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা। এসবের প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণে।
ব্যাংকগুলো যে ঋণ আদায় করছে, তার কম নতুন ঋণ বিতরণ করছে। এর ফলে গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর ফলে নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন বিনিয়োগে তেমন গতি নেই। বিশেষ করে শিল্প-ব্যবসা খাতে ঋণ যাচ্ছে খুবই কম। যা ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার বড় অংশ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য। এ ছাড়া কিছু ভোক্তা ঋণ বিতরণ হচ্ছে। ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাত চাঙা হতে হবে। তখন এমনিতেই ঋণপ্রবাহ বাড়বে। অতীতে বেনামে অনেক ঋণ গেছে, যা বিনিয়োগে তেমন একটা কাজে লাগেনি।
বেসরকারি খাত চাঙা করতে নতুন উদ্যোগ
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ে, সে জন্য সরকার নতুন নীতি নিয়েছে। নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ ২১ মাস কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর অবশেষে সেই নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। এতে ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগও তৈরি হতে পারে। আর ঋণের সুদ কমলে তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যদিও গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা মনে করেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিবেচনায় আনেন উদ্যোক্তারা। আর করনীতি, ঘুষ–দুর্নীতির মতো পুরোনো সমস্যা তো কারণ হিসেবে আছেই।
বেসরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যা ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। আর গত জুন শেষে ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মে মাসে যা ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে। এর আগে এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সংকটের সময়ও এই প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেকগুলো ব্যাংক সমস্যায় পড়ায় ঋণ কার্যক্রম প্রায় গুটিয়ে ফেলেছে। এ ছাড়া নতুন বিনিয়োগ তেমন একটা নেই। ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ শুরু হলে এটা বাড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ যাওয়াটা জরুরি।
গতি ফিরবে কি
অর্থনীতির গতি বাড়াতে একদিকে সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এ জন্য নীতি সুদহার কমিয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন খাতের জন্য স্বল্প সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এদিকে দেশের বৃহত্তম ব্যাংক হলো রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক। এই ব্যাংকের ঋণসীমাও তুলে নিয়েছে। ফলে ব্যাংকটি গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইচ্ছেমতো ঋণ দিতে পারবে।
নীতি সুদহার কমানোর যুক্তি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।
ব্যবসায় গতি কম
উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে শ্লথগতি রয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের সুদের হার কমলে ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে। এতে অর্থের সরবরাহ বাড়লে নতুন করে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে।
এ কে খান গ্রুপের পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, অর্থনীতির সূচকগুলো অনেক দিন ধরেই খারাপ অবস্থায় আছে। অর্থনীতির গতি ফেরাতে নতুন সরকার সক্রিয় আছে। বেশ কিছু পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তবে সূচকগুলো ইতিবাচক অবস্থায় ফিরতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। কারণ, অর্থনীতির এই পরিস্থিতি এক দিনে হয়নি। তাই রাতারাতি ঠিক করা যাবে না।
আবুল কাসেম খান আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরোনো আইন পরিবর্তন করে ব্যবসা শুরু করাটা বিকাশ হিসাব খোলার মতো সহজ করে দিতে হবে। এতে নতুন প্রজন্ম আগ্রহী হবে। বিদেশিরাও এ দেশে আসবে।