প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬
এম এম মাহবুব হাসান

নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে নিয়োজিত কোটি কোটি মানুষের অক্লান্ত শ্রম যদি না থাকত, তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই গল্প এত দূর আসতে পারত না।
১ মে শুধু শ্রমিক অধিকারের দিবস নয়; এটি শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য পাওনা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।
তা হলো স্বাধীনতার ৫৫ বছরে যে শ্রমিকের ঘাম, মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ভিত গড়ে উঠেছে, সেই শ্রমিক কি আজও উন্নয়নের ন্যায্য অংশীদার হতে পেরেছেন?
শ্রমশক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে শ্রমবাজারে সক্রিয় জনবলের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ।
এর মধ্যে পুরুষ প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ এবং নারী প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ; অর্থাৎ শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এখন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যা গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই বিশাল শ্রমশক্তির বড় অংশ কৃষি, শিল্প, সেবা ও অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্প ও সেবা খাত মিলিয়ে অবদান ৮৮ শতাংশের বেশি আর এই প্রবৃদ্ধির পেছনে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান অনস্বীকার্য।
আবার শ্রমশক্তি জরিপের হিসাব বলছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৫ কোটি ৮০ লাখ বা ৮৪ শতাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। এটি শ্রমবাজারের কাঠামোগত বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
তবে সংখ্যার আড়ালে আরেক বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক গবেষণা অনুযায়ী, মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশকে তুলনামূলকভাবে দক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; বাকি বড় অংশ আধা দক্ষ বা অদক্ষ।
এই দক্ষতার ঘাটতি শুধু ব্যক্তির আয় সীমিত করে না, জাতীয় উৎপাদনশীলতাকেও বাধাগ্রস্ত করে। শ্রমের পরিমাণে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে শক্তিশালী, কিন্তু শ্রমের গুণগত মানোন্নয়নে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান স্তম্ভ। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন, যাঁদের ৬৫ শতাংশই নারী। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই একটি খাত থেকে।

নির্মাণ, পরিবহন, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে নিয়োজিত কোটি কোটি মানুষের অক্লান্ত শ্রম যদি না থাকত, তবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই গল্প এত দূর আসতে পারত না।
অন্য স্তম্ভটি প্রবাসী শ্রমিক। বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির বড় অংশই শ্রমজীবী মানুষ। তাঁরা প্রতিবছর যে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠান, তার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোক্তা ব্যয় এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগ—সর্বত্র এই অর্থের প্রভাব গভীরভাবে বিস্তৃত। মোদ্দাকথা, ‘রপ্তানি’ আর ‘রেমিট্যান্স’—এই দুই শিরায় যে রক্ত প্রবাহিত হয়, তার উৎস বাংলাদেশের শ্রমিক।
শ্রমিকের অবদানের বিপরীতে সুরক্ষার চিত্র
কিন্তু এই বিপুল অবদানের বিপরীতে শ্রমিকের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা মূল্যায়িত হয়? উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত মজুরি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যঝুঁকি, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং চাকরির অনিশ্চয়তার মধ্যে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আজও আর্থিকভাবে সুরক্ষাহীন।
বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত মানুষের একটি বড় অংশ সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন, বিমা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কাজে লাগানোর মতো সঞ্চয়—এর কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। আয় থামলেই অনেকে দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিছলে পড়েন।
উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই চকচকে হোক, শ্রমজীবী মানুষের এই ভঙ্গুরতা জাতীয় অর্থনীতির একটি অস্বস্তিকর সত্য।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি থেকে আর্থিক ক্ষমতায়ন
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি ব্যাংক হিসাব খোলা নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি।
সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা, নিরাপদ সঞ্চয়, সহজ লেনদেন, স্বল্প সুদে ঋণ, ক্ষুদ্র বিমা, পেনশন ও ডিজিটাল পেমেন্ট—সব মিলিয়ে এটি একজন শ্রমিককে অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে এটিই তাঁর আর্থিক ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ব্যাংকের শাখা, উপশাখা, এজেন্ট আউটলেট ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার ‘নো-ফ্রিলস’ বা নামমাত্র খরচের হিসাবের মাধ্যমে কৃষক, শ্রমিক, অতিদরিদ্র, প্রবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষকে আর্থিক ব্যবস্থার ছাতার নিচে নিয়ে আসতে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), পুনঃ অর্থায়ন তহবিল এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন ও ঋণ বিতরণের মতো উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ (অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৫) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৯২ লাখ ৩২ হাজার। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ১১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
পর্যালোচনার সময়ে এসব হিসাবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৮২৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭৫০ কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে ১ লাখ ২ হাজার ৬০৬ জন গ্রাহককে স্বল্প সুদে প্রায় ৯০১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে গতি সঞ্চার করছে।
কিন্তু অন্তর্ভুক্তি আর ক্ষমতায়ন এক কথা নয়। অ্যাকাউন্ট আছে, কিন্তু সঞ্চয় নেই; ডিজিটাল ওয়ালেট আছে, কিন্তু আর্থিক পরিকল্পনার ধারণা নেই—এই অসম্পূর্ণতাও সমান বাস্তব। তাই পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত ‘অ্যাকসেস’ বা অভিগম্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পূর্ণ আর্থিক ‘এমপাওয়ারমেন্ট’ বা ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।