প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬
বিশেষ প্রতিনিধি ঃ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে রাজস্ব খাতে নিয়োগকৃত ২৫৭ সহকারী প্রকৌশলীকে গোপনে পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার মধ্যেই বিভিন্ন অজুহাতে তাদের পদোন্নতি দিতে সম্প্রতি এলজিইডি থেকে দুই দফায় মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এতে পদোন্নতির বিকল্প হিসাবে ‘চলতি দায়িত্ব’ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের পদায়নের সুপারিশ করেছেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেন গত ১০ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দাপ্তরিক পত্র পাঠান। চিঠিতে এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত ৫ম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী বা সমমানের পদ চলতি দায়িত্বের মাধ্যমে পূরণের কথা উল্লেখ করা হয়। বেলাল হোসেন প্রকল্প থেকে আসা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও সমমর্যাদার পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন।
চিঠির এক স্থানে তিনি বলেন, ‘এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোতে রাজস্ব বাজেটভুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর ১৬৮টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্য আছে ১১৪টি, যা জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ বেতনক্রমের ৫ম গ্রেডের পদ। এ ছাড়া উন্নয়ন বাজেটভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী বা উপ-প্রকল্প পরিচালক ও উপ-পরিচালকের পদ রয়েছে ১১২টি। এই ১১২টির মধ্যে ১৬টি পদ প্রেষণে পূরণ করা হয়েছে। সব মিলে বর্তমানে ২১০টি পদ শূন্য।’
প্রস্তাবের আরেক স্থানে এ বিষয়ে বলা হয়, ‘কর্মকর্তাদের যোগদানের ভিত্তিতে ইতোপূর্বে ৩৩৩ জনের পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ‘পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে মামলা’ চলমান থাকায় পদোন্নতি দেওয়া যায়নি। পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে বিধায় ‘চলতি দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পূরণ করার বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য।’ প্রস্তাবিত শূন্য পদগুলোর কারণে বিভাগ, অঞ্চল ও সদর দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। কৌশলে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত ২৫৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে ৫ম গ্রেডে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন-এমনটাই মনে করছেন বঞ্চিত কর্মকর্তরা।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাহমুদ জাহেদী বলেন, সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতির বিষয়ে আলোচ্য আবেদন সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেনের বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়বস্তু উল্লেখ করে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
যুগান্তরের একটি সুত্র উল্লেখ করা হলো : ‘এলজিইডির নিয়োগবিধি তছনছ’ শিরোনামে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর যুগান্তরে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী ব্যারিস্টার আরিফ চৌধুরী ও ব্যারিস্টার উম্মে আইমান জেনিব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। পরে এ বিষয়ে শুনানি নিয়ে ৯ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. আকরাম হোসেন চৌধুরী ও বিচারপতি রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত বেঞ্চ প্রকল্প থেকে ২৫৭ জনকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংঘটিত অনিয়মের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয় : উচ্চ আদালতে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ২৫৭ জনের চাকরি নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা গণনার ক্ষেত্রে বিধিমালা এবং বিধিমালার স্পষ্টীকরণ-সংক্রান্ত পরিপত্র অনুসরণ করেনি। নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি বিধায় ত্রুটিপূর্ণ প্রজ্ঞাপনের শর্তানুযায়ী ২৫৭ জনের জ্যেষ্ঠতা গণনা করারও সুযোগ নেই। এমনকি তাদের ৭ম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড প্রদান এবং ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি প্রদান করারও আইনগত সুযোগ ছিল না। যদিও স্থানীয় সরকার বিভাগ সব বিধিবিধান পাশ কাটিয়ে আদালতের (২০১১ সালে প্রকল্পভুক্ত সহকারী প্রকৌশলীদের একটি রীট) রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ২৫৭ জনকে বিধিবহির্ভূত প্রক্রিয়ায় নিয়মিতকরণসহ পদোন্নতি প্রদান করেছে। যেহেতু ২৫৭ জনের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা প্রদান বিধিসম্মত হয়নি, তাই তাদের যে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, সেটিও আইনসম্মত হয়নি।