প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ
ঢাকা জেলা জামায়াত আয়োজিত সদস্য (রুকন) সম্মেলন। আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর আইডিইবি মাল্টিপারপাস হলে
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘গায়ে যদি আপনার সাদা কাপড় থাকে, আপনাকে যত্নশীল হতে হবে… সাদা কাপড়ে দাগ লাগে, কথা ঠিক না। সাদা কাপড়ে কম লাগে, কিন্তু যা লাগে, তা ভাসে। ভেরি কেয়ারফুল।’
নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী কোনো ছাড় দেয় না মন্তব্য করে দলটির আমির বলেন, দলের কারও অন্যায় ধরা পড়লে তা সহনীয় মাত্রার হলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে, কিন্তু গুরুতর হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মাল্টিপারপাস হলে ঢাকা জেলা জামায়াত আয়োজিত সদস্য (রুকন) সম্মেলনে এ কথা বলেন শফিকুর রহমান।
দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতাদের দল নয়, আমরাও মানুষ। আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়। আমরা পরিষ্কার বলেছি যে অন্যায় আর জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে চলে না। কিন্তু এর দ্বারা এটাও আমরা মিন করছি না যে আমরা কোনো অন্যায় করি না।…আমাদের অন্যায়-অপরাধ দেখলে ধরে দিন। আমরা কথা দিচ্ছি, সংশোধন করব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজ দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন অন্যদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা না করে নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজে মনোযোগ দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সব বিষয়ে এক্সপার্ট, কিন্তু ওনার নিজের মন্ত্রণালয়ের ওপর উনি এক্সপার্ট নন কেন? যাঁর যাঁর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, তাঁদের পালন করার সুযোগ দিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব আপনার পালন করার দরকার নেই। ওনাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। আপনি আপনার মন্ত্রণালয়ে অ্যাটেনশন দিন। জাতিকে শান্তিতে থাকতে দিন।’
দেশে ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘আগের দিন এক হুইপকে বলতে দেখেছেন, যেকোনো দেশ থেকেই যে-ই আসুক, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজিকে জাতীয়করণ করা হলো কি না, তা আল্লাহই জানেন।’
শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, চাঁদাবাজি তাঁরাই করেন। সদিচ্ছা থাকলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু সদিচ্ছা না থাকলে তা কোনোভাবেই বন্ধ হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, তবে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাঁরা হস্তক্ষেপ করতে চান না। তাঁর মতে, প্রতিটি দেশের জনগণই তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একইভাবে, অন্য কোনো দেশও যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে।
সীমান্ত পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তি বিঘ্নিত হলে আপনারাও শান্তিতে থাকতে পারবেন না।’
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ক্ষমতায় এসে দেশপ্রেমিক ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছিল দাবি করে জামায়াতের আমির বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের নামে তামাশা করা হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, এ–সংক্রান্ত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জনগণ বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে জানানো হয়নি, বরং তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে অনেক গোপন তথ্য বেরিয়ে আসত। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাঁদের পেছনের কালো শক্তির বিষয়ও সামনে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবিধান নিয়ে সতর্কবার্তা
সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বেশি সংবিধান কচলাতে যাইয়েন না। সংবিধান কচলালে নিজেদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবেন না। সংবিধানে অনেক কিছু আছে, এখনো হাত দিতে পারেন নাই। হাত দিতে পারবেন কি না, তা–ও জানি না।’
বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, কেউ যদি সংবিধানে নেই বলে গণভোটকে অবৈধ বলেন, তাহলে একই যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও একই যুক্তিতে অবৈধ হবে।
তাঁর দাবি, জনগণ শুধু সংবিধান সংশোধনের নয়, সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার যদি সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথে যায়, তাহলে সেটি হবে ‘মতলবি সংশোধন’, যা জামায়াত মেনে নেবে না।
গণ–অভ্যুত্থান ও শহীদের সংখ্যা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ৩ থেকে ৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। জাতিসংঘ সম্ভাব্য ১ হাজার ৪৫২ জনের মৃত্যুর কথা বললেও কেউ সংখ্যাটা দুই হাজার বা তার কমবেশি বলছে। কারণ, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে যাদের হত্যা ও গুম করা হয়েছে, তাদের অনেকের হিসাব পাওয়া যাবে না।
শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত নিজস্ব উদ্যোগে শহীদদের তালিকা ও প্রোফাইল তৈরির কাজ করছে। এ পর্যন্ত ১২টি ভলিউম সম্পন্ন হয়েছে, ১৩তম ভলিউমের কাজ চলছে।
গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে জেনেছেন, নতুন সরকারের কেউ তাঁদের দেখতে যায়নি। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের সম্মানী ভাতা না বাড়ানো এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ না রাখারও সমালোচনা করেন তিনি।
ঢাকা জেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন)।