প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০২৬
প্রকাশিত:
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণ ঘিরে এনসিটিবির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিম্মি করে অতিরিক্ত মূল্যে কাগজ কেনার বাধ্যবাধকতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে প্রায় ২৫ হাজার টন কাগজ অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হয়েছেন প্রকাশকরা, যার ফলে তাদের পকেট থেকে বাড়তি প্রায় ৫৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে জোরেশোরে চলছে মুদ্রণ কাজ।
কাগজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও জিম্মি দশা
প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিংয়ের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন বিএইচএল পেপার মিলস থেকে এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক মানের কাগজ কিনে ছাপাখানায় আনলেও সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপে তা আটকে দেওয়া হয়। এনসিটিবির একটি টিম যাচাই ছাড়াই কাগজগুলোকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করায় তিনি তা ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে একই সিন্ডিকেটের নির্ধারিত এজেন্ট থেকে টনপ্রতি ২২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে নিম্নমানের কাগজ কিনে তাকে মুহূর্তেই অনুমোদন নিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিন্ডিকেট যে কাগজ ১ লাখ ৩ হাজার টাকায় সরবরাহ করার কথা, তা অনেক ছাপাখানাকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। তবে কিছু প্রকাশক সরকারের উচ্চ মহলে যোগাযোগ করায় এবং শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে মেঘনা গ্রুপের ‘ফ্রেশ পেপার’-এর মতো মানসম্মত কাগজ অনুমোদন করিয়ে নিতে সক্ষম হয়। ফলে ঐ নির্দিষ্ট ৯০০ টন কাগজ নিয়ে সিন্ডিকেট কোনো ‘অনুমোদন বাণিজ্য’ করতে পারেনি। অন্যদিকে, ২ লাখ পাঠ্যবইকে কাগজ-কলমে ‘আড়াই লাখ’ দেখিয়ে অনুমোদন দিতে রাজি না হওয়ায় এক ইন্সপেকশন এজেন্টের মালিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই
প্রতিবছরের ১ জানুয়ারি নতুন বই দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এবার বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ী:
প্রাথমিক স্তর: আগামী ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন পাঠ্যবই হাতে পাবে।
মাধ্যমিক স্তর: ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থী নতুন বই পেয়ে যাবে।
মোট শিক্ষার্থী: প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী এই কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
মুদ্রণ কাজের বর্তমান অগ্রগতি ও গতি বাড়াতে নজরদারি
মাতুয়াইলের ছাপাখানাগুলোতে বর্তমানে দিনরাত চলছে বই ছাপানো, কাটিং, বাঁধাই ও প্যাকেজিংয়ের কাজ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী মুদ্রণের চিত্র নিম্নরূপ:
প্রাথমিক স্তর: প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শতভাগ এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৯৭.৯৫ শতাংশ বই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে।
মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি স্তর: ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৯৬.০৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বিভিন্ন ধাপে মুদ্রণ কাজ চলছে। মাধ্যমিকের কার্যাদেশ এক মাস দেরিতে শুরু হওয়ায় এর অগ্রগতি তুলনামূলক কিছুটা কম।
কাজের গতি বাড়াতে এবং মান নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে ৩২টি প্রেসকে তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন যে, নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুযায়ীই বই সরবরাহ ও মুদ্রণের কাজ সফলভাবে এগিয়ে চলছে।