৩১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার,রাত ২:৫৭

সংঘাত নয়, সুস্থ রাজনীতি ও সুষ্ঠু নির্বাচনই দেশের ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত: জুলাই ৩০, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা কাজল ঃ দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে আজ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আত্মাহুতির পর তৈরি হওয়া এই নতুন পরিবেশে জনগণের মূল চাওয়া এখন খুবই স্পষ্ট—একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বাংলাদেশ। দেশের মানুষ আর রাজপথের সংঘাত, মারামারি, রাস্তা অবরোধ কিংবা অস্থিতিশীলতা দেখতে চায় না।

 

বর্তমানে দেশের নাগরিকরা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বন্দনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা অপেক্ষা করছে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের জন্য। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো জনগণের ভোটাধিকার। জনগণের রায়ে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারা সরকার পরিচালনা করবে, আর পরাজিত দল হবে সরকারের গঠনমূলক সমালোচক ও সহযোগী। এই সুস্থ চর্চাই দেশে আইনের শাসন, সামাজিক স্থিতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।

 

তবে নতুন এই পটভূমিতে যদি আবার অহেতুক সংঘাত, মিথ্যা অপপ্রচার, চরিত্রহনন ও প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু হয়, তবে তা দেশের জন্য চরম আত্মঘাতী হবে। ইতিহাস সাক্ষী—যেসব দল বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাই আগামী দিনে ক্ষমতার লড়াইয়ের চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ‘জনকল্যাণ’ই প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া কেবল দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই সম্ভব, প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়।

 

ইতিহাসের নানা অধ্যায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তর্ক-বিতর্ক ও ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ, দেশের এক চরম সংকটকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক মূল্যায়ন রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে নিজেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং অস্ত্র হাতে সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে কখনো এ কৃতিত্বের দাবি করেননি। সিপাহী-জনতা তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিল। একইভাবে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে তরুণ ছাত্রসমাজ ‘ছাত্রঐক্য’ গঠন করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সফল করে। কিন্তু তারাও কখনো এ কৃতিত্বের দাবি করেনি।

 

একইভাবে, দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপির রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সাধারণ শ্রমজীবী ও সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার স্ব-স্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখাই পরিপক্কতার পরিচয়।

 

রাজনীতি কোনো ক্ষণিকের আবেগ বা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়; রাজনীতি হলো ধৈর্য, বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক জ্ঞান এবং জনগণের ভাষা বোঝার ক্ষমতা। রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। যে দল জনগণের এই প্রত্যাশাকে সম্মান জানাতে পারবে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারাই টিকবে। কারণ রাজনীতিবিদদের রাজনীতি হওয়া উচিত জনগণের জন্য, লোভ-লালসা, মোহ কিংবা ক্ষমতার জন্য নয়।

  • শেয়ার করুন