১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার,রাত ১০:১৬

শিরোনাম
আইড্যাব ফুটসাল ফেস্ট ২০২৬-এর ট্রফি উন্মোচন সোনারগাঁয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যানটিনে গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ ১২ স্ত্রী নিজেও সামর্থ্যবান হলে আলাদা কোরবানি কি ওয়াজিব? সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর সুন্দরবনে বনদস্যুদের সাথে বনকর্মীদের গুলি বিনিময়, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অপহৃত ৪ জেলে উদ্ধার বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করলে পুলিশে দিন: এমপি এনাম জাতীয় পেনশন স্কিমে ৩২ মাসে যুক্ত হয়েছে ৩.৭৭ লাখ মানুষ, জমা ২৫৫ কোটি জনগণের চাহিদায় সংবিধান সংস্কার হওয়া উচিত: ঢাবি উপাচার্য বিআরটিএ’র নম্বর প্লেট ব্যবহার না করলে ব্যবস্থা: ডিএমপি

বিদেশিদের হেনস্তাকারী আকাশের বিলাসী জীবন

প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি  ঃ

 

মো. আকাশ

ট্যাটু দেখাতে অর্ধনগ্ন হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন মো. আকাশ (২৫)। পাশে দামি ম্যাকবুক, দুটি দামি হাতঘড়ি, চারটি ভিসা কার্ড, দুটি ব্রেসলেট আর ১০টি মোবাইল ফোন। এগুলোর মধ্যে চারটি দামি আইফোন। এমন বিলাসী জীবনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন আকাশ। তিনি কখনো নিজের সোয়া ৬ লাখ টাকার আরওয়ানফাইভ বাইকে চড়ার ছবি দেন, আবার কখনো কোটি টাকার ক্রাউন ক্রসওভার প্রাইভেট কার চালানোর ভিডিও দেন।

‘রাজকীয়’ জীবন যাপন করা আকাশের জন্ম রাজশাহী নগরের ভদ্রা লেকের পাশের বস্তিতে। বাবা মো. সেলিম ও মা শরিফা বেগম এখনো বস্তিতেই থাকেন। সেলিম এখনো ভাগাড় থেকে ভাঙারি কুড়িয়ে সংসার চালান। আর শরিফা বেগম ৩ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন গৃহকর্মীর। অভিযোগ আছে, জুয়ার বোর্ড চালিয়ে এমন রাজকীয় জীবন যাপন করেন আকাশ।

সম্প্রতি নাটোরের গ্রিন ভ্যালি পার্কে ঘুরতে যাওয়া বিদেশি নাগরিকদের হেনস্তা করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন আকাশ। বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি। এ নিয়ে মামলা হলেও এখনো আকাশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফেসবুকে আকাশের ফলোয়ার ১৮ লাখের বেশি। জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম মো. আকাশ হলেও তিনি টিকটকে হয়েছেন আরিয়ান মাহমুদ আকাশ। জানা গেছে, তিনি পড়াশোনা করেছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। তবে ফেসবুকে লিখে রেখেছেন, তাঁর পড়াশোনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আকাশ ফেসবুক-টিকটকে প্রকাশ করেন অশ্লীল ও আপত্তিকর কনটেন্ট। থাকেন যুবদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে ছবি তোলেন। তবে এখন তিনি রয়েছেন আত্মগোপনে। পুলিশের দাবি, বখাটে আকাশকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮ মে ‘টিকটক বন্ধু মিলন মেলা-২০২৬’ নামের একটি অনুষ্ঠানের জন্য শতাধিক তরুণ-তরুণী পার্কে সমবেত হন। পরদিন আকাশসহ কয়েকজন বখাটে তরুণ গ্রিন ভ্যালি পার্কে ঘুরতে যাওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত রুশ নাগরিকদের হেনস্তা করছেন এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ ওই বিদেশিদের নিয়ে নানা অশ্লীল, আপত্তিকর কথা বলছেন।

এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। এ নিয়ে পার্কের ব্যবস্থাপক অজ্ঞাত তরুণদের আসামি করে লালপুর থানায় মামলা করেন। এই মামলায় রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার হরিদাগাছি গ্রাম থেকে আমিনুল ইসলাম (২৯) নামের এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু মূল হেনস্তাকারী যুবদল কর্মী আকাশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আজ বুধবার ভদ্রা লেকের পারের বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, টিনে দিয়ে ঘেরা এক কক্ষের একটি বাড়িতে বাস করেন আকাশের বাবা, মা আর বোন। তাঁরা জানালেন, এই বাড়িতেই থাকতেন আকাশ। বছর দুয়েক আগে বিয়ে করেছেন। তারপর বউ নিয়ে ভদ্রা জামালপুরে একটি ভাড়া বাসায় উঠেছেন। তারপর বস্তিতে তেমন একটা আসেন না। সারাক্ষণ ফেসবুক-টিকটকের জন্য বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও করেন।

স্থানীয় লোকজন জানায়, টিকটকার হয়ে ওঠার আগে এলাকার বখাটেদের নিয়ে চুরি-ছিনতাই করতেন আকাশ। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. নজুর সঙ্গে একটি জুয়ার বোর্ড চালাতেন। জুয়ার বোর্ড থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা পকেটে নেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুয়ার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ এখন আকাশের হাতে। পাশাপাশি তিনি ভদ্রা বস্তি এলাকায় মাদক কারবারের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। টিকটক ভিডিও করার জন্য দল বেঁধে ঘুরে বেড়ান। মেয়েদের উত্ত্যক্ত করেন। তাঁদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ। মাস ছয়েক আগে ভদ্রা এলাকায় রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) পার্কে টিকটকার আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে বিনা টিকিটে ঢুকতে না দেওয়ায় এক আনসার সদস্যকে মেরে নাক ফাটিয়ে দেন আকাশ। এই ঘটনায় পার্কের ব্যবস্থাপক বাদী হয়ে চন্দ্রিমা থানায় মামলা করলে আকাশ ২৫ দিন জেলে থাকেন। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি। মামলাটি এখন রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ বিচারাধীন। এই মামলার ধার্য তারিখ ছিল আজ। আকাশ আদালতে হাজির হননি। আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে অসুস্থতার খবর জানিয়েছেন তিনি।

আদালতের পেশকার আব্দুর রাজ্জাক জানান, আসামি আকাশ হাজির না হওয়ায় তাঁর আইনজীবী মেহেদী হাসান আদালতে সময়ের আবেদন করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে হঠাৎ অসুস্থতার কারণে আসামি হাজির হতে পারেননি। আদালতের বিচারক মো. আতাউল্লাহ আবেদন গ্রহণ করেছেন। মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১২ আগস্ট।

আকাশের বাবা মো. সেলিম বলেন, ‘লালপুরের পার্কের ঘটনার পর সকালে দুজন পুলিশ এসে খোঁজখবর নিয়ে যায়। পরে রাতে তাকে খুঁজতে আরও ২০ জন ডিবি পুলিশ এসেছিল। তারা খোঁজাখুঁজি করে। কিন্তু আমার ছেলে এখন কোথায় আছে আমি জানি না।’

ভদ্রা এলাকাটি রাজশাহী নগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের যুবদলের নেতা-কর্মীরা নিশ্চিত করেছেন, আকাশ যুবদলের কর্মী। বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নেন। তবে তাঁর কোনো পদ নেই। রগচটা স্বভাব বলে কিছুদিন ধরে তাঁকে এড়িয়ে চলছেন স্থানীয় নেতারা। তবে আকাশকে চেনেন না বলে জানিয়েছেন মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি।

বিদেশি নাগরিকদের হেনস্তার ছয় দিন পার হলেও আকাশ গ্রেপ্তার না হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার পর আমরা একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তবে বিদেশি নাগরিকদের হেনস্তার ঘটনার মূল হোতা টিকটকার আকাশ। রাজশাহী পুলিশ তাঁর ব্যাপারে তথ্য পেতে আমাদের সহযোগিতা করেছে। তাঁকে ধরতে আমরা কয়েকবার অভিযানও চালিয়েছি; কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

কথা বলার জন্য টিকটকার আকাশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।  ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে আকাশ বলেছেন, ‘বিদেশিদের সঙ্গে একটু মজা করেই ভিডিও বানাই। তবে বিদেশিদের হেনস্তা করার নিয়ত ছিল না। তারাও মজা পাচ্ছিল। হয়তোবা আমার মজাটা একটু বেশিই ছিল। এভাবে হয়তো কথা বলা উচিত ছিল না। সবাই আমাকে মাফ করবেন।’

 

  • শেয়ার করুন