১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার,রাত ৩:৩৪

রক্তে ভেজা নাদিমের লাশও নিতে চেয়েছিল পুলিশ

প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২৫

  • শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ

১৯ জুলাই ২০২৪। দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার কথা ছিল নাদিম মিজানের। বাবার অপেক্ষায় ছোট্ট আহনাফআনাস। স্বামীকে নিয়ে একসঙ্গে হয়ত দুপুরের খাবার খাবেন বলে আশায় ছিলেন তাবাসসুম আক্তার নিহা। কিন্তু মসজিদ থেকে বের হতেই পুলিশবিজিবির ছোড়া গুলি লাগে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির পেটে। রক্তে ভেজা দেহে তাকে বাসায় নিয়ে যান স্থানীয়রা। তবে স্বামীর রক্তাক্ত শরীর দেখেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন স্ত্রী। মিনিট দশেক পর হুঁশ ফেরার পর শুনতে পান প্রিয়তম স্বামীর মৃত্যুর খবর। তিন বছরের আনাসও বিচার চায় বাবার খুনিদের।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শহীদ নাদিমের স্ত্রী নিহার সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এমন হৃদয়বিদারক বর্ণনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায়  ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল সোমবার (৩ নভেম্বর)। ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বেঞ্চে নিহার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

নিহার বাবার বাসা রাজধানীর রামপুরা এলাকায়। আর নাদিমের বাড়ি মিরপুর-১ নম্বরে। তবে বনশ্রীতে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা করতেন তিনি। তার দুই ছেলে। বড় ছেলে আহনাফের বয়স চার বছর। তিন বছরের আনাসকে নিয়েই এ দিন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসেন নিহা। মায়ের সঙ্গে ছোট্ট আনাসও বারবার যেন কিছু বলতে চেয়েছিল বাবার হত্যার বিচার নিয়ে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জিজ্ঞেস করতেই বলে ওঠে ‘বাবার হত্যার বিচার চাই, খুনিদের ফাঁসি চাই।’ বাসা কিংবা এলাকায়ও কাউকে দেখলে এমন শব্দ উচ্চারণ করে বলে জানান তার মা।

জবানবন্দিতে নিহা বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই (শুক্রবার) আমার স্বামী জুমার নামাজ পড়তে রামপুরা থানার সামনের মসজিদে যান। আড়াইটার দিকে রক্তাক্ত-গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে বাসায় নিয়ে আসেন স্থানীয় লোকজন। তার পেট থেকে আমি রক্ত ঝরতে দেখি। এমন অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাই। পাঁচ-দশ মিনিট পর জ্ঞান ফিরলে জানতে পারি আমার স্বামীকে স্থানীয় অ্যাডভান্স হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বাইরে তখনো অনবরত গুলি চলছিল। এজন্য আমি হাসপাতালে যেতে পারিনি। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা নাদিমকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে নেওয়া লোকদের কাছে আমি এ কথা শুনেছি। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর থানার সামনে পুলিশ ও বিজিবির ছোড়া গুলিতে আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানতে পারি।

তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে নাদিমের লাশ এনে বাসার নিচে রাখা হয়। ঠিক তখনই লাশ নিয়ে যেতে চায় রামপুরা থানার পুলিশ। পরে আমরা লাশটি দোতলায় বাসায় নিয়ে যাই। ওই সময় আমাদের বাসায় ও আশপাশে প্রচুর আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা জড়ো হন। তখন হেলিকপ্টার থেকে আমাদের বাসা ও ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। একটি টিয়ারশেল মায়ের শরীরে লাগতে গেলে আমার দুলাভাই রক্ষা করেন। তখন আমার মা ছাদে ছিলেন। একপর্যায়ে টিয়ারশেলটি ছাদে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। আমি রুমে বসে হেলিকপ্টারের শব্দ শোনার পাশাপাশি টিয়ারশেলের গন্ধ পাই। এতে আমার চোখমুখ জ্বলতে থাকে।

এ সাক্ষী আরও বলেন, ওইদিন রাত ১০টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নাদিমের লাশ নিজ বাড়ির পাশে মিরপুর-১ নম্বর ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ১১টার দিকে জানাজা হয়। জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এসময় স্বামীর হত্যার জন্য শেখ হাসিনা ও গুলি ছোড়া পুলিশদের দায়ী করেন তিনি। একইসঙ্গে স্বামীর হত্যার বিচার চান।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে নিহাকে জেরা করেন আসামি এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের আইনজীবী সারওয়ার জাহান ও পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সাইমুম রেজা তালুকদারসহ অন্যরা।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। হাবিবুর ছাড়া পলাতক বাকি তিন আসামি হলেন– খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। গত ১০ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

  • শেয়ার করুন